মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয় নয়। এটি আসলে বিশ্ব রাজনীতির এক গভীর পরিবর্তনের সংকেত। গত কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক চলাচল যে অলিখিত নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, এখন সেই কাঠামো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়তে পারে এশিয়ায়।
হরমুজ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, এখন আর শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকলেই সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তুলনামূলক দুর্বল রাষ্ট্রও কম খরচের প্রযুক্তি—ড্রোন, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, মাইন কিংবা নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যকে অচল করে দিতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু বাস্তব অবরোধ নয়, অবরোধের আশঙ্কাই আজ বিশ্ববাজারে বিশাল অস্থিরতা তৈরি করার জন্য যথেষ্ট।
এই বাস্তবতা এশিয়ার জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ মূলত জ্বালানি পরিবহনের কেন্দ্র হলেও এশিয়ার সামুদ্রিক পথগুলো বিশ্ব অর্থনীতির আরও বিস্তৃত শিরা-উপশিরা। বাণিজ্য, জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর, প্রযুক্তি সরবরাহ—সবকিছুই নির্ভর করছে কয়েকটি সংকীর্ণ জলপথের ওপর। ফলে এখানে যদি হরমুজের মতো কৌশল প্রয়োগ শুরু হয়, তার প্রভাব হবে বহুগুণ বেশি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো মালাক্কা প্রণালি। পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এবং চীনের বিপুল জ্বালানি আমদানি এই পথ দিয়ে যায়। বহু বছর ধরেই বেইজিং “মালাক্কা দ্বিধা” নিয়ে চিন্তিত। কারণ এই রুটে কোনো ধরনের অবরোধ বা নিয়ন্ত্রণ চীনের অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। হরমুজ সংকট সেই আশঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তুলেছে।
চীন ইতিমধ্যেই বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা করছে। মিয়ানমার, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়া হয়ে স্থলপথে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, ভারত মহাসাগর অঞ্চলে বন্দর সুবিধা বৃদ্ধি এবং আর্কটিক রুট নিয়ে আগ্রহ—সবই একই কৌশলের অংশ। অর্থাৎ বেইজিং বুঝতে পারছে, ভবিষ্যতের সংঘাত শুধু স্থল বা আকাশে নয়, বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রতিযোগিতা কি কেবল চীনকে ঘিরে? বাস্তবে নয়। মালাক্কা প্রণালিতে কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও। কারণ আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতি এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে একটি প্রণালির সংকট মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ সংকট এবং শিল্প উৎপাদনে ধস নামাতে পারে।

হরমুজ পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা। এতদিন ধারণা ছিল, বড় শক্তিগুলো অন্তত বৈশ্বিক বাণিজ্য সচল রাখার প্রশ্নে কিছু সীমারেখা মানবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, সেই সংযম দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং নৌ চলাচলকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার—সব মিলিয়ে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
এই প্রবণতা যদি এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাইওয়ান প্রণালি সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কেন্দ্রে পরিণত হবে। বিশ্বে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের মূল কেন্দ্র তাইওয়ান। সেখানে অবরোধ মানে শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়; বরং বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্প, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বড় অংশ থমকে যাওয়া। আধুনিক বিশ্বে চিপ ছাড়া অর্থনীতি প্রায় অচল। ফলে তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো সামুদ্রিক সংঘাত বৈশ্বিক মন্দার সূত্রপাতও করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামরিক কৌশলের নতুন রূপ। আগে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ মানে ছিল বড় যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরী। এখন বাস্তবতা ভিন্ন। হরমুজে ইরান দেখিয়েছে, ছোট কিন্তু ছড়িয়ে থাকা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দিয়েও শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে আটকে রাখা যায়। এই ধারণাই চীনের “অ্যান্টি-অ্যাকসেস” কৌশল এবং তাইওয়ানের “পর্কুপাইন ডিফেন্স”-এর ভিত্তি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট প্রণালিগুলোও এখন নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। মালাক্কা প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটলে জাহাজ চলাচলকে ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা বা লম্বক প্রণালির মতো বিকল্প পথে যেতে হবে। ফলে এই রুটগুলো নিয়েও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং—দুই পক্ষই বুঝতে পারছে, ভবিষ্যতের সংঘাতে শুধু প্রধান সমুদ্রপথ নয়, বিকল্প পথের নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সমস্যা হলো, এই পুরো পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে ভুগছে, অন্যদিকে চীন আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে উন্মুক্ত সমুদ্রপথ রক্ষার জন্য যে বহুপাক্ষিক ঐক্য প্রয়োজন, সেটিই এখন সবচেয়ে অনিশ্চিত।
এই অবস্থায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সামুদ্রিক চলাচলের স্বাধীনতাকে কেবল আইনি নীতির প্রশ্ন হিসেবে না দেখে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ বিশ্ব অর্থনীতি এখন এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে একটি সংকীর্ণ জলপথে সংঘাত পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে।
হরমুজ সংকট তাই কেবল মধ্যপ্রাচ্যের গল্প নয়। এটি আসলে ভবিষ্যতের এক সতর্কবার্তা। যদি বড় শক্তিগুলো জলপথকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে, তাহলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন ধরনের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠবে। আর সেই সংঘাতের মূল্য শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নয়, পুরো বিশ্বকেই দিতে হবে।
লিন কুয়ক 



















