০১:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
পাকিস্তানে চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফের আশ্বাস শাহবাজ শরিফের পাকিস্তানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিরাপত্তা জোরদার, গঠন হচ্ছে ‘ওয়াপডা সিকিউরিটি ফোর্স’ আসামে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিল উত্থাপন, বিজেপি শাসিত তৃতীয় রাজ্যে নতুন বিতর্ক ভারতে আবারও বাড়তে পারে জ্বালানির দাম, মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাড়ছে চাপ আজ দেশের ১০ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত পদ্মা সেতুতে স্বস্তির ঈদযাত্রা, এখনো নেই যানজট ঈদযাত্রায় তিন মহাসড়কে বড় শঙ্কা, কোথায় বেশি যানজটের আশঙ্কা ঢাকার হাটে মাঝারি গরুতেই ঝুঁকছেন ক্রেতারা ট্রাম্পের নতুন গ্রিন কার্ড নীতি: অভিবাসনকে আরও অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দেওয়ার রাজনীতি হরমুজ প্রণালি খুললেও দ্রুত কমবে না তেলের দাম, শঙ্কা কাটছে না বৈশ্বিক বাজারে

শিশুদের দুঃখের গল্প এত গভীরভাবে কেন নাড়া দেয়

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজেকে শক্ত করে তুলতে শেখে। কষ্ট লুকোনো, ভেঙে না পড়া, সবকিছু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সামলে নেওয়াই যেন প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের অলিখিত নিয়ম। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, সবচেয়ে অপ্রস্তুত করে দেয় সেই গল্পগুলো, যেগুলো মূলত শিশুদের জন্য লেখা। একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র, একটি ছোট্ট উপন্যাস, কিংবা কোনও শিশুচরিত্রের নিঃসঙ্গতা— হঠাৎ করেই মানুষের ভেতরের বহুদিনের চাপা আবেগকে টেনে বাইরে এনে ফেলে।

অনেকেই স্বীকার করেন, শিশুদের গল্প বা সিনেমা দেখতে গিয়ে তাঁরা অকারণে কেঁদে ফেলেন। বাস্তব জীবনের কঠিন সংবাদ, রাজনৈতিক সংকট বা ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের সময় যে মানুষ নিজেকে সামলে রাখতে পারেন, তিনিই হয়তো একটি কাল্পনিক প্রাণীর মৃত্যু বা একটি শিশুর একাকীত্ব দেখে অস্থির হয়ে ওঠেন। এই প্রতিক্রিয়া নিছক আবেগপ্রবণতা নয়। বরং এটি মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এমন এক স্তরের প্রকাশ, যেটিকে দৈনন্দিন জীবন প্রায় অদৃশ্য করে দেয়।

শিশুদের গল্পে দুঃখ থাকে, কিন্তু সেই দুঃখ সাধারণত নিষ্ঠুরতার জন্য নয়। সেখানে কষ্টের ভেতর দিয়ে আশার দিকে এগোনোর একটি পথ থাকে। কোনও চরিত্র হারিয়ে যায়, কেউ একা হয়ে পড়ে, কোনও সম্পর্ক ভেঙে যায়— কিন্তু গল্প শেষ হয় এমন এক জায়গায়, যেখানে পাঠক বা দর্শক মনে করেন, সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। এই সামান্য আশাবোধই হয়তো মানুষকে টেনে রাখে।

প্রাপ্তবয়স্কদের পৃথিবীতে বিষয়গুলো অনেক বেশি জটিল। সম্পর্কের মধ্যে হিসাব থাকে, প্রতিযোগিতা থাকে, নিরাপত্তাহীনতা থাকে। মানুষ ক্রমে শিখে যায় কোথায় দুর্বলতা দেখানো যাবে না। কিন্তু শিশুদের গল্পে আবেগগুলো সরাসরি আসে। বন্ধুত্ব মানে সত্যিকারের বন্ধুত্ব, ভয় মানে স্পষ্ট ভয়, ভালোবাসা মানে নির্ভেজাল ভালোবাসা। এই সরলতাই বড়দের কাছে এক ধরনের হারিয়ে যাওয়া জগতের মতো মনে হয়।

The Bizarre Tragedy of Children's Movies - The Atlantic

শিশুসাহিত্য আসলে কেবল শিশুদের জন্য নয়। ভালো শিশুতোষ গল্প এমন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যা বয়সের সীমা অতিক্রম করে যায়। কারণ এসব গল্প মানুষকে তার সেই সময়টির মুখোমুখি দাঁড় করায়, যখন পৃথিবীকে সে এত জটিলভাবে দেখতে শিখেনি। বড় হওয়ার আগে মানুষ অনেক বেশি সরল ছিল, অনেক বেশি অসহায়ও ছিল। কিন্তু সেই অসহায়ত্বের মধ্যেই ছিল এক ধরনের সততা।

আজকের পৃথিবীতে সেই অনুভূতিগুলো আরও মূল্যবান হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন যুদ্ধ, সহিংসতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা সামাজিক বিভাজনের খবর মানুষের মনে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি করে। মানুষ ধীরে ধীরে অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। আশাবাদকে সরলতা বলে মনে হতে শুরু করে। ঠিক এই জায়গাতেই শিশুদের গল্প অন্যরকম কাজ করে। তারা মনে করিয়ে দেয়, ভয় ও ক্ষতির মধ্যেও মানুষ আশা করতে পারে।

তবে এই অনুভূতিকে বাজারও ব্যবহার করতে শিখেছে। “ইনার চাইল্ড” বা ভেতরের শিশুকে খুঁজে পাওয়ার নামে অসংখ্য বাণিজ্যিক ধারণা এখন জনপ্রিয়। কিন্তু মানুষের ভঙ্গুরতা কোনও পণ্যে পরিণত হওয়ার বিষয় নয়। শিশুদের গল্পের শক্তি এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, তারা মানুষকে দুর্বল হতে শেখায় না; বরং মনে করিয়ে দেয়, সংবেদনশীল হওয়া মানেই দুর্বল হওয়া নয়।

আসলে শিশুরা পৃথিবীতে সবচেয়ে কম ক্ষমতাবান মানুষদের মধ্যে পড়ে। বড়দের সিদ্ধান্ত, বড়দের ভুল, বড়দের সংঘাত— সবকিছুর প্রভাব তাদের জীবনে গিয়ে পড়ে। অথচ প্রাপ্তবয়স্ক সমাজ এই সত্যটি খুব সহজেই ভুলে যায়। বড় হওয়ার অর্থই যেন অনেক সময় ভুলে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা। নিজের পুরোনো ভয়, পুরোনো কষ্ট, পুরোনো স্বপ্ন— সবকিছুকে দূরে সরিয়ে রাখা।

এই কারণেই হয়তো শিশুদের গল্প এত প্রয়োজনীয়। তারা মানুষকে অতীতে ফিরিয়ে নেয় না; বরং মনে করিয়ে দেয়, কোন জিনিসগুলো হারিয়ে ফেলার পরও আমরা বুঝতে পারিনি যে সেগুলো হারিয়ে গেছে। একটি শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে আবার দেখতে পারা হয়তো কোনও সহজ সমাধান নয়। কিন্তু সেটি মানুষকে অন্তত কিছুটা বেশি মানবিক করে তোলে। আর এই সময়ের পৃথিবীতে, সেটিই হয়তো সবচেয়ে জরুরি গুণ।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাকিস্তানে চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফের আশ্বাস শাহবাজ শরিফের

শিশুদের দুঃখের গল্প এত গভীরভাবে কেন নাড়া দেয়

১১:০০:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজেকে শক্ত করে তুলতে শেখে। কষ্ট লুকোনো, ভেঙে না পড়া, সবকিছু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সামলে নেওয়াই যেন প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের অলিখিত নিয়ম। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, সবচেয়ে অপ্রস্তুত করে দেয় সেই গল্পগুলো, যেগুলো মূলত শিশুদের জন্য লেখা। একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র, একটি ছোট্ট উপন্যাস, কিংবা কোনও শিশুচরিত্রের নিঃসঙ্গতা— হঠাৎ করেই মানুষের ভেতরের বহুদিনের চাপা আবেগকে টেনে বাইরে এনে ফেলে।

অনেকেই স্বীকার করেন, শিশুদের গল্প বা সিনেমা দেখতে গিয়ে তাঁরা অকারণে কেঁদে ফেলেন। বাস্তব জীবনের কঠিন সংবাদ, রাজনৈতিক সংকট বা ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের সময় যে মানুষ নিজেকে সামলে রাখতে পারেন, তিনিই হয়তো একটি কাল্পনিক প্রাণীর মৃত্যু বা একটি শিশুর একাকীত্ব দেখে অস্থির হয়ে ওঠেন। এই প্রতিক্রিয়া নিছক আবেগপ্রবণতা নয়। বরং এটি মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এমন এক স্তরের প্রকাশ, যেটিকে দৈনন্দিন জীবন প্রায় অদৃশ্য করে দেয়।

শিশুদের গল্পে দুঃখ থাকে, কিন্তু সেই দুঃখ সাধারণত নিষ্ঠুরতার জন্য নয়। সেখানে কষ্টের ভেতর দিয়ে আশার দিকে এগোনোর একটি পথ থাকে। কোনও চরিত্র হারিয়ে যায়, কেউ একা হয়ে পড়ে, কোনও সম্পর্ক ভেঙে যায়— কিন্তু গল্প শেষ হয় এমন এক জায়গায়, যেখানে পাঠক বা দর্শক মনে করেন, সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। এই সামান্য আশাবোধই হয়তো মানুষকে টেনে রাখে।

প্রাপ্তবয়স্কদের পৃথিবীতে বিষয়গুলো অনেক বেশি জটিল। সম্পর্কের মধ্যে হিসাব থাকে, প্রতিযোগিতা থাকে, নিরাপত্তাহীনতা থাকে। মানুষ ক্রমে শিখে যায় কোথায় দুর্বলতা দেখানো যাবে না। কিন্তু শিশুদের গল্পে আবেগগুলো সরাসরি আসে। বন্ধুত্ব মানে সত্যিকারের বন্ধুত্ব, ভয় মানে স্পষ্ট ভয়, ভালোবাসা মানে নির্ভেজাল ভালোবাসা। এই সরলতাই বড়দের কাছে এক ধরনের হারিয়ে যাওয়া জগতের মতো মনে হয়।

The Bizarre Tragedy of Children's Movies - The Atlantic

শিশুসাহিত্য আসলে কেবল শিশুদের জন্য নয়। ভালো শিশুতোষ গল্প এমন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যা বয়সের সীমা অতিক্রম করে যায়। কারণ এসব গল্প মানুষকে তার সেই সময়টির মুখোমুখি দাঁড় করায়, যখন পৃথিবীকে সে এত জটিলভাবে দেখতে শিখেনি। বড় হওয়ার আগে মানুষ অনেক বেশি সরল ছিল, অনেক বেশি অসহায়ও ছিল। কিন্তু সেই অসহায়ত্বের মধ্যেই ছিল এক ধরনের সততা।

আজকের পৃথিবীতে সেই অনুভূতিগুলো আরও মূল্যবান হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন যুদ্ধ, সহিংসতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা সামাজিক বিভাজনের খবর মানুষের মনে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি করে। মানুষ ধীরে ধীরে অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। আশাবাদকে সরলতা বলে মনে হতে শুরু করে। ঠিক এই জায়গাতেই শিশুদের গল্প অন্যরকম কাজ করে। তারা মনে করিয়ে দেয়, ভয় ও ক্ষতির মধ্যেও মানুষ আশা করতে পারে।

তবে এই অনুভূতিকে বাজারও ব্যবহার করতে শিখেছে। “ইনার চাইল্ড” বা ভেতরের শিশুকে খুঁজে পাওয়ার নামে অসংখ্য বাণিজ্যিক ধারণা এখন জনপ্রিয়। কিন্তু মানুষের ভঙ্গুরতা কোনও পণ্যে পরিণত হওয়ার বিষয় নয়। শিশুদের গল্পের শক্তি এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, তারা মানুষকে দুর্বল হতে শেখায় না; বরং মনে করিয়ে দেয়, সংবেদনশীল হওয়া মানেই দুর্বল হওয়া নয়।

আসলে শিশুরা পৃথিবীতে সবচেয়ে কম ক্ষমতাবান মানুষদের মধ্যে পড়ে। বড়দের সিদ্ধান্ত, বড়দের ভুল, বড়দের সংঘাত— সবকিছুর প্রভাব তাদের জীবনে গিয়ে পড়ে। অথচ প্রাপ্তবয়স্ক সমাজ এই সত্যটি খুব সহজেই ভুলে যায়। বড় হওয়ার অর্থই যেন অনেক সময় ভুলে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা। নিজের পুরোনো ভয়, পুরোনো কষ্ট, পুরোনো স্বপ্ন— সবকিছুকে দূরে সরিয়ে রাখা।

এই কারণেই হয়তো শিশুদের গল্প এত প্রয়োজনীয়। তারা মানুষকে অতীতে ফিরিয়ে নেয় না; বরং মনে করিয়ে দেয়, কোন জিনিসগুলো হারিয়ে ফেলার পরও আমরা বুঝতে পারিনি যে সেগুলো হারিয়ে গেছে। একটি শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে আবার দেখতে পারা হয়তো কোনও সহজ সমাধান নয়। কিন্তু সেটি মানুষকে অন্তত কিছুটা বেশি মানবিক করে তোলে। আর এই সময়ের পৃথিবীতে, সেটিই হয়তো সবচেয়ে জরুরি গুণ।