দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটন অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্র। একদিকে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি পর্যটক, অবসরপ্রাপ্ত বিদেশি, ডিজিটাল যাযাবর ও বিনিয়োগকারীদের টানতে নানা ধরনের সুবিধা দিচ্ছে; অন্যদিকে থাইল্যান্ড ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে। ৯৩ দেশের নাগরিকদের জন্য চালু থাকা ৬০ দিনের ভিসামুক্ত থাকার সুযোগ অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তাও। সেই বার্তাটি হলো—দীর্ঘ ভিসামুক্ত অবস্থান বিদেশি অপরাধ বাড়ায়।
কিন্তু এমন একটি দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে প্রমাণ। আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে: সরকার কি সত্যিই দেখাতে পারবে যে ভিসামুক্ত থাকার সময় কমানোর ফলে অপরাধ কমে যাবে?
সরকারের মন্ত্রীরা বহুদিন ধরেই ৬০ দিনের সুবিধাকে “অতিরিক্ত দীর্ঘ” বলে আখ্যা দিয়ে আসছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, দীর্ঘ সময় বিদেশিদের ওপর নজরদারি কঠিন করে তোলে এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্তে সমস্যা তৈরি করে। শুনতে এটি যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিসংখ্যান অন্য একটি চিত্র তুলে ধরে।
থাইল্যান্ডে আসা অধিকাংশ পর্যটক গড়ে নয় দিনের মতো অবস্থান করেন। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক বিদেশিই ৩০ দিনের কাছাকাছিও থাকেন না, ৬০ দিনের প্রশ্ন তো আরও পরে। তাহলে যেসব মানুষ এক মাসের আগেই দেশ ছেড়ে চলে যান, তাদের ক্ষেত্রে ভিসার মেয়াদ অর্ধেকে নামিয়ে আনার বাস্তব প্রভাব কী?
এখানে সরকারের যুক্তির একটি অন্তর্নিহিত দুর্বলতা রয়েছে। যদি বলা হয় দীর্ঘ অবস্থানের সুযোগ অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি করে, তাহলে ধরে নিতে হবে অপরাধে জড়িতদের বড় অংশই দীর্ঘমেয়াদি পর্যটক। কিন্তু বাস্তবে আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র, অবৈধ ব্যবসা, অর্থপাচার বা সংঘবদ্ধ প্রতারণা কেবল পর্যটক ভিসার দৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয় না। এসব নেটওয়ার্ক সাধারণত দুর্বল আইন প্রয়োগ, দুর্নীতি, প্রশাসনিক ফাঁকফোকর এবং ভুয়া ব্যবসায়িক কাঠামো ব্যবহার করে নিজেদের কার্যক্রম চালায়।
অর্থাৎ সমস্যার মূল যদি হয় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, তাহলে ভিসার মেয়াদ কমানো একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হতে পারে, কার্যকর সমাধান নয়।

আর এখানেই সরকারের ওপর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ এখন তারা সরাসরি একটি কারণ-ফল সম্পর্ক দাঁড় করিয়েছে: দীর্ঘ ভিসামুক্ত অবস্থান মানেই বেশি অপরাধ। সেক্ষেত্রে আগামী মাসগুলোতে যদি বিদেশি অপরাধের হার দৃশ্যমানভাবে না কমে, তাহলে পুরো যুক্তিটিই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তাহলে কী দেখা উচিত? বিদেশিদের জড়িত অপরাধে গ্রেপ্তার কমছে কি না। অবৈধ ব্যবসা ও আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক দুর্বল হচ্ছে কি না। ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণের সংখ্যা কমছে কি না। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ হ্রাস পাচ্ছে কি না। এসব সূচকে পরিবর্তন না এলে বলা কঠিন হবে যে নীতিগত পরিবর্তন বাস্তব ফল দিয়েছে।
কারণ প্রতিটি নতুন সীমাবদ্ধতার অর্থনৈতিক মূল্যও আছে। পর্যটন থাইল্যান্ডের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। সেখানে বিদেশিদের জন্য অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা বা জটিলতা তৈরি করলে তার প্রভাব শুধু বিমানবন্দরেই থেমে থাকে না; হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা—সবখানেই পড়ে।
বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন প্রতিবেশী দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের জন্য আরও আকর্ষণীয় নীতি তৈরি করছে, তখন থাইল্যান্ডের এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে আত্মবিশ্বাসী নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক বলে মনে হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব বড় অপরাধের ঘটনা শিরোনাম হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে সাধারণ পর্যটকের সম্পর্ক ছিল না। কোথাও অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধার হয়েছে, কোথাও আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেই অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা দেখায় যে নিরাপত্তা সংকটের শিকড় অনেক গভীরে।
তাই প্রশ্নটি কেবল ভিসার মেয়াদ নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, সরকার কি সহজ একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপকে জটিল নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান হিসেবে তুলে ধরছে?
যদি তাই হয়, তাহলে এই সিদ্ধান্ত হয়তো রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা কার্যকর নীতির বিকল্প হতে পারবে না। আর যদি সরকার সত্যিই বিশ্বাস করে যে এই পরিবর্তন অপরাধ কমাবে, তাহলে এখন তাদের সামনে একমাত্র পথ হলো ফলাফল দেখানো। কারণ একটি নীতির সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থন আসে বক্তৃতা থেকে নয়, বাস্তব পরিসংখ্যান থেকে।
ভ্যানিচ কিত্তিচাই 


















