জলবায়ু পরিবর্তন ও ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের সংকট আরও গভীর হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, দেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলার মানুষের জীবন, জীবিকা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এখন ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় বাজেটে উপকূলীয় সংকটের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির আহ্বায়ক আমিনুর রসুল বাবুল। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, উপকূলীয় অঞ্চল দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় জলবায়ু সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ এখনও অপ্রতুল।

উপকূলীয় অঞ্চলের গুরুত্ব
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের উপকূলীয় অঞ্চল শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেই নয়, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাতেও বড় ভূমিকা রাখছে। সুন্দরবন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমায়। একই সঙ্গে এটি কার্বন শোষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, চিংড়ি, কাঁকড়া ও সামুদ্রিক মাছ রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলেও উপকূলীয় এলাকার জন্য আলাদা ও লক্ষ্যভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষ বরাদ্দ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি
সভাপতির বক্তব্যে আমিনুর রসুল বাবুল বলেন, উপকূলীয় পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় বিশেষ বাজেট বরাদ্দ এখন সময়ের দাবি। তিনি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সুন্দরবন সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। এজন্য সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

২১ দফা দাবি উত্থাপন
সংবাদ সম্মেলনে একটি ২১ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে ১৯টি উপকূলীয় জেলার ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নে উপকূল উন্নয়ন বোর্ড গঠন।
এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য পৃথক অফিস স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়। বক্তারা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালীর মতো জলবায়ু ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ঘোষণা করার দাবি জানান।
তারা আরও বলেন, পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার, দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এখন অত্যন্ত জরুরি।
বক্তাদের মতে, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, উপকূলীয় মানুষের ঘরবাড়িকেও দুর্যোগ সহনশীল করে গড়ে তোলা সময়ের বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















