পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি কেবল ভোটের বয়স নিয়ে নয়; এটি রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পর্ক নিয়ে। ক্ষমতাসীন মহলের একাংশ সম্প্রতি ভোটদানের ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে বাড়িয়ে ২৫ করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। সরকারি পর্যায়ে পরে সেটিকে “আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়” বলে ব্যাখ্যা করা হলেও বিষয়টি যে নিছক একটি বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়, তা সহজেই বোঝা যায়। কারণ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ধরনের প্রস্তাব একটি বৃহত্তর মানসিকতার প্রতিফলন—যেখানে তরুণদের রাজনৈতিক শক্তিকে সম্ভাবনা নয়, বরং ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে ভোটের বয়স ১৮। কোথাও কোথাও তা আরও কমিয়ে ১৬ করার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক সময়ে কোনো রাষ্ট্র ভোটের বয়স উল্টো বাড়ানোর পথে হাঁটেনি। এর পেছনে একটি মৌলিক যুক্তি আছে। একজন তরুণ যদি রাষ্ট্রের পরিচয়পত্র পেতে পারে, কর দিতে পারে, গাড়ি চালানোর অনুমতি পায় কিংবা দেশের জন্য যুদ্ধ করতে পারে, তাহলে সে নিজের সরকার বেছে নেওয়ার অধিকারও রাখে। নাগরিকত্বের দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ দিয়ে রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

পাকিস্তানের বাস্তবতায় এই বিতর্ক আরও সংবেদনশীল। দেশটির জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী নিবন্ধিত ভোটারই দুই কোটির বেশি। অর্থাৎ ভোটের বয়স ২৫ করা হলে প্রতি ছয়জন ভোটারের একজন সরাসরি ভোটাধিকার হারাবে। আর জনগণনার তথ্য ধরলে এই বয়সসীমার মোট জনগোষ্ঠী আরও বড়। এমন এক সমাজে, যেখানে তরুণদের সংখ্যা ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, সেখানে তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমিয়ে দেওয়া কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও।
এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বিষয়টি উপেক্ষা করা কঠিন। গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের তরুণ ভোটারদের বড় অংশ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর রাজনৈতিক প্রচার, প্রচলিত দলগুলোর প্রতি হতাশা এবং নতুন নেতৃত্বের আকর্ষণ তরুণদের রাজনৈতিক আচরণে পরিবর্তন এনেছে। ফলে তরুণ ভোটারদের বাদ দেওয়া মানে শুধু ভোটার সংখ্যা কমানো নয়; এটি নির্বাচনের শক্তির ভারসাম্যও বদলে দিতে পারে। তাই এই প্রস্তাবকে অনেকেই নিছক প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রকৌশল হিসেবে দেখছেন।
তবে সমস্যাটি আরও গভীর। পাকিস্তানের তরুণ সমাজ দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের অবহেলিত মনে করে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সীমিত সামাজিক গতিশীলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মের বড় অংশের বিশ্বাস—রাষ্ট্র তাদের কথা শোনে না। তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এমন পরিস্থিতিতে ভোটাধিকার সীমিত করা মানে তাদের হতাশা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।

গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি নাগরিককে রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত রাখার পদ্ধতি। তরুণদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিলে সাময়িকভাবে কোনো দল বা সরকার সুবিধা পেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা বাড়ায়। যখন একটি প্রজন্ম মনে করতে শুরু করে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে তাদের জায়গা নেই, তখন তারা হয় চরম হতাশায় ডুবে যায়, নয়তো বিকল্প ও কখনও বিপজ্জনক পথের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
আজকের বিশ্বে তরুণরা শুধু ভোটার নয়; তারা সামাজিক প্রবণতা নির্ধারণ করে, রাজনৈতিক ভাষা বদলে দেয় এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চরিত্র নির্মাণ করে। পাকিস্তানের মতো একটি দেশে, যেখানে জনমিতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে, সেখানে তরুণদের রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করা মানে দেশের ভবিষ্যৎ শক্তিকেই দুর্বল করা।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই স্থিতিশীলতা চায়, তাহলে তরুণদের বাদ দেওয়া নয়, বরং আরও বেশি সম্পৃক্ত করার পথ খুঁজতে হবে। কারণ যে প্রজন্ম আগামী দিনের অর্থনীতি চালাবে, সমাজ গড়বে এবং রাষ্ট্রের বোঝা বহন করবে, তাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে কোনো গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না। বরং তাতে জন্ম নেয় আরও গভীর বিচ্ছিন্নতা, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তা। আর শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষতির ভার বহন করতে হয় পুরো রাষ্ট্রকেই।
মালিহা লোধি 


















