মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অভিঘাত সাধারণত প্রথমে তেলের বাজারে ধাক্কা দেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ইরানকে ঘিরে সংঘাত বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও এলএনজির সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি করেছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে নীরব থেকেও আরেকটি জ্বালানি খাত ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতায় ঢুকে পড়েছে—কয়লা। বিশেষ করে এশিয়ার তাপবিদ্যুৎ নির্ভর অর্থনীতিগুলোতে কয়লার চাহিদা আবারও বাড়তে শুরু করেছে, আর সেই পরিবর্তন শুধু যুদ্ধের কারণে নয়; এর পেছনে রয়েছে চীনের উৎপাদন দুর্বলতা, ইন্দোনেশিয়ার নীতিগত পরিবর্তন এবং বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ।
গত এক দশকে বহু দেশ কয়লার ব্যবহার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কার্বন নির্গমন কমানো এবং জলবায়ু লক্ষ্যকে সামনে রেখে কয়লাকে “অতীতের জ্বালানি” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি প্রায়ই রাজনৈতিক ঘোষণার চেয়ে আলাদা পথে হাঁটে। যখন গ্যাসের দাম বেড়ে যায়, তেলের বাজার অনিশ্চিত হয়, আর বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকে, তখন শিল্প ও বিদ্যুৎখাত দ্রুত এমন জ্বালানির দিকে ফিরে যায় যা তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য এবং নির্ভরযোগ্য। সেই জায়গাটিই আবার দখল করছে কয়লা।
চীনের পরিস্থিতি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা উৎপাদক ও আমদানিকারক দেশটি কয়েক মাস ধরেই অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে চাপের মুখে রয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিক খনি দুর্ঘটনা নিরাপত্তা তদারকি আরও কঠোর করেছে। এর ফলে বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। একই সময়ে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ চাহিদা কমেনি। ফলে দেশটি আবারও সমুদ্রপথে কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
চীনের এই বাড়তি চাহিদা পুরো এশীয় বাজারকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার নিম্নমানের কয়লার দাম দ্রুত বেড়েছে, কারণ চীনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এই ধরনের কয়লার বড় ক্রেতা। বাজারে যে মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা শুধু যুদ্ধজনিত আতঙ্ক নয়; বরং সরবরাহ ও চাহিদার বাস্তব ভারসাম্য বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত।
ভারতের অবস্থাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে বিদ্যুতের ব্যবহার রেকর্ড ছুঁয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়লেও দেশের বিদ্যুৎ কাঠামো এখনও বড় অংশে কয়লাভিত্তিক। ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতি এড়াতে ভারতও আবার কয়লা আমদানি বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ এশিয়ার দুই বৃহত্তম অর্থনীতি একই সময়ে কয়লার দিকে ঝুঁকছে—এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

এই প্রেক্ষাপটে ইন্দোনেশিয়ার সিদ্ধান্ত বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়লা রপ্তানিকারক দেশটি রপ্তানি বাণিজ্যে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের যুক্তি হচ্ছে, এতে রাজস্ব ফাঁকি কমবে এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার সাধারণত নীতিগত অনিশ্চয়তাকে পছন্দ করে না। ব্যবসায়ীরা এখন বুঝতে চেষ্টা করছেন নতুন কাঠামো কীভাবে কাজ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে।
ফলে অস্ট্রেলিয়ার মতো রপ্তানিকারক দেশগুলো নতুন সুযোগ দেখতে শুরু করেছে। বিশেষ করে যদি ইন্দোনেশিয়া থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে অস্ট্রেলীয় কয়লা বিকল্প উৎস হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এতে বৈশ্বিক কয়লা বাণিজ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রও আংশিক বদলে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতি কি সাময়িক, নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার সূচনা? বাস্তবতা হচ্ছে, জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে বিশ্ব যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছে, তার সঙ্গে বর্তমান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি স্পষ্ট দূরত্ব রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনও অনেক দেশে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের পুরো বিকল্প হয়ে ওঠেনি। ব্যাটারি সংরক্ষণ, গ্রিড আধুনিকীকরণ এবং বিকল্প জ্বালানি অবকাঠামো পর্যাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত কয়লার মতো প্রচলিত জ্বালানি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
বরং বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশ্ব এখন এক ধরনের “সংক্রমণকালীন জ্বালানি রাজনীতি”-তে প্রবেশ করেছে। এখানে পরিবেশগত লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিদ্যুৎ নিরাপত্তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে এশিয়ার দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোতে শিল্প উৎপাদন ও নগরজীবন সচল রাখতে সরকারগুলো শেষ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য জ্বালানিকেই অগ্রাধিকার দেবে।
অর্থাৎ কয়লার যুগ হয়তো শেষ হয়নি; বরং নতুন বাস্তবতায় সেটি আবারও নিজের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করছে। আর সেটিই বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতির সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য।
ক্লাইড রাসেল 



















