০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিশ্চিতভাবে যুদ্ধ শেষ হবে না, বদলে যাবে যুদ্ধের ধরন রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি

ইন্দোনেশিয়ার আতিথেয়তার সীমাবদ্ধতা

ইন্দোনেশিয়ায় চীনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে দেশটিতে কার্যরত চায়না চেম্বার অব কমার্স। ১২ মে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর কাছে পাঠানো পাঁচ পৃষ্ঠার এক চিঠিতে সংগঠনটি অভিযোগ করে, হঠাৎ হঠাৎ নীতিমালা পরিবর্তন এবং কিছু কর্মকর্তার চাঁদাবাজির কারণে বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। পরদিন প্রাবোও নিজেও স্বীকার করেন, কিছু আমলা ঘুষ আদায়ের জন্য নিয়ম তৈরি করেন।

ইন্দোনেশিয়া বহুদিন ধরেই নিজেকে অতিথিপরায়ণ দেশ হিসেবে তুলে ধরে আসছে। দেশটির মানুষের হাসিমুখ, খোলা মন আর বিদেশিদের স্বাগত জানানোর সংস্কৃতি জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বের অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী এখন ঠিক উল্টো অভিজ্ঞতার অভিযোগ তুলছে।

আন্তর্জাতিক জরিপ প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেশনসের ২০২৪ সালের ‘এক্সপ্যাট ইনসাইডার’ জরিপে ইন্দোনেশিয়া ৫৩ দেশের মধ্যে বন্ধুসুলভ আচরণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ৯০ শতাংশের বেশি বিদেশি অংশগ্রহণকারী বলেছেন, তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আন্তরিক স্বাগত পেয়েছেন। কিন্তু বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পরিস্থিতি আলাদা। বিশ্বব্যাংকের ‘বিজনেস রেডি ২০২৪’ প্রতিবেদনে নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও কার্যকারিতার দিক থেকে দেশটি নিচের স্তরে রয়েছে।

চীনা ব্যবসায়ীদের অভিযোগগুলো ছিল অত্যন্ত নির্দিষ্ট। খনিজ সম্পদের রয়্যালটি বারবার বাড়ানো, কর তদন্তের নামে কোটি কোটি ডলারের জরিমানা এবং রপ্তানি আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা অন্তত এক বছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে জমা রাখার বাধ্যবাধকতা তাদের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এমনকি কিছু বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারস্থ হতে হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাবও ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। চেম্বারের হিসাব অনুযায়ী, শুধু নিকেল খাতেই চার লাখের বেশি শ্রমিক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। কিছু বড় খনির উৎপাদন কোটা এ বছর ৭০ শতাংশের বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার কারণে আকরিকের দাম প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্লেষকেরা বলছেন, নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণেই রুপিয়াহ দীর্ঘদিন ধরে চাপের মুখে রয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত যে, চীনা বিনিয়োগকারীরা দুর্বল শাসনব্যবস্থা বা ঝুঁকিপূর্ণ বাজারেও সহজে ব্যবসা করতে পারে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার বাস্তবতা দেখাচ্ছে, তারাও স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা চায়। দুর্নীতির চেয়েও অনিশ্চিত নীতিগত পরিবেশ তাদের কাছে বড় সমস্যা হয়ে উঠছে।

চীনা বিনিয়োগের বড় প্রবাহ শুরু হয় ২০১৩ সালে শি জিনপিংয়ের ইন্দোনেশিয়া সফরের পর। স্থানীয় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং সিঙ্গাপুর ও হংকংভিত্তিক বিনিয়োগ চ্যানেলের মাধ্যমে এই অর্থ প্রবেশ করে। ইন্দোনেশিয়ার পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চীনের বিনিয়োগ ছিল ১৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা সিঙ্গাপুরের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সময় ‘হিলিরিসাসি’ বা দেশে খনিজ সম্পদ প্রক্রিয়াজাতকরণের নীতি চালু হয়। সরকার বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ১০ থেকে ১৫ বছরের কর ছাড়, নির্মাণসামগ্রী আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার এবং জমি ব্যবহারে সহজ সুযোগ দেয়। এর ফলে বহু চীনা প্রতিষ্ঠান স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করে।

ফোর্বসের ২০২৩ সালের তালিকা অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার ৫০ ধনী ব্যক্তির সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ২৫২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, এদের ৮৪ শতাংশই চীনা বংশোদ্ভূত ইন্দোনেশীয়। এসব পরিবারের অনেকেই বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকাশ্যে সমর্থনও দিয়েছিলেন।

Chinese investors warn Prabowo over Indonesia policies hurting investment  confidence

এখন সেই দীর্ঘমেয়াদি অংশীদাররাই চাপের মুখে পড়েছেন। রয়্যালটি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ নীতি এবং উৎপাদন কোটা কমানোর মতো সিদ্ধান্ত সরাসরি তাদের ব্যবসায় আঘাত হানছে। অর্থাৎ, এগুলো শুধু বাইরের কোনো স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারীর ওপর প্রভাব ফেলছে না, বরং সরকারের আমন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন বিনিয়োগ করা অংশীদারদেরও সংকটে ফেলছে।

এতে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসেছে—ইন্দোনেশিয়ার আতিথেয়তা আসলে কতটা বাস্তব? বিদেশিদের জন্য যে আন্তরিকতার গল্প প্রচার করা হয়, বাস্তবে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ নিয়ে আসা অংশীদারদের ক্ষেত্রে সেই আচরণ অনেকটাই সীমিত হয়ে যাচ্ছে। চেম্বারের চিঠি মূলত সেই ব্যবধানই তুলে ধরেছে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে বিনিয়োগকারীদের সব দাবি অন্ধভাবে মেনে নিতে হবে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে রেমপাং ইকো-সিটি প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয় জনগণ উচ্ছেদের অভিযোগ সামনে আসে। অনেকের মতে, কিছু চীনা অর্থায়িত প্রকল্প স্থানীয় জনগণের সম্মতি ও স্বার্থকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। আতিথেয়তা মানে পুঁজির কাছে আত্মসমর্পণ নয়।

জাকার্তা-বান্দুং দ্রুতগতির রেল প্রকল্পও একই বাস্তবতার আরেক উদাহরণ। ২০১৫ সালে চীন এই প্রকল্পের কাজ পায় মূলত সরকারি বাজেট ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের মাধ্যমে প্রকল্পটি অর্থায়ন করা হয়। কিন্তু ২০২৩ সালে ব্যয় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাওয়ার পর সরকারকে আংশিক আর্থিক গ্যারান্টি দিতে হয় এবং পরিচালনার মেয়াদ ৫০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়।

এই পরিস্থিতির পেছনে আর্থিক চাপও রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার কর আদায় দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের আশেপাশে আটকে আছে। প্রাবোও সরকারের সামাজিক কর্মসূচির ব্যয় বাড়ায় সরকার সহজ লক্ষ্য হিসেবে সম্পদ রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। কিন্তু বাইরে থেকে এটি হঠাৎ সিদ্ধান্ত ও অস্থির নীতিমালা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ভিয়েতনাম ২০২৪ সালে প্রায় ৩৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ টেনেছে, কারণ দেশটির বিনিয়োগ আইন প্রকল্পভিত্তিক কর সুবিধা পুরো লাইসেন্স মেয়াদজুড়ে নিশ্চিত করে। বিপরীতে ইন্দোনেশিয়ায় নিকেল রয়্যালটি নীতি ও রপ্তানি আয় সংরক্ষণ নীতি এ বছর কোনো পরামর্শ ছাড়াই কার্যকর হয়েছে। এই অনিশ্চয়তার প্রভাব শুধু বিনিয়োগকারীদের নয়, প্রকল্প এলাকার শ্রমিক ও স্থানীয় জনগণের জীবনেও পড়ছে।

ইন্দোনেশিয়া এখনই বড় ধরনের বিনিয়োগ সংকটে পড়েনি। তবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর প্রকাশ্য অভিযোগ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। জাকার্তা এই বার্তাকে কতটা গুরুত্ব দেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জনপ্রিয় সংবাদ

নিশ্চিতভাবে যুদ্ধ শেষ হবে না, বদলে যাবে যুদ্ধের ধরন

ইন্দোনেশিয়ার আতিথেয়তার সীমাবদ্ধতা

০৮:১৯:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ায় চীনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে দেশটিতে কার্যরত চায়না চেম্বার অব কমার্স। ১২ মে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর কাছে পাঠানো পাঁচ পৃষ্ঠার এক চিঠিতে সংগঠনটি অভিযোগ করে, হঠাৎ হঠাৎ নীতিমালা পরিবর্তন এবং কিছু কর্মকর্তার চাঁদাবাজির কারণে বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। পরদিন প্রাবোও নিজেও স্বীকার করেন, কিছু আমলা ঘুষ আদায়ের জন্য নিয়ম তৈরি করেন।

ইন্দোনেশিয়া বহুদিন ধরেই নিজেকে অতিথিপরায়ণ দেশ হিসেবে তুলে ধরে আসছে। দেশটির মানুষের হাসিমুখ, খোলা মন আর বিদেশিদের স্বাগত জানানোর সংস্কৃতি জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বের অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী এখন ঠিক উল্টো অভিজ্ঞতার অভিযোগ তুলছে।

আন্তর্জাতিক জরিপ প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেশনসের ২০২৪ সালের ‘এক্সপ্যাট ইনসাইডার’ জরিপে ইন্দোনেশিয়া ৫৩ দেশের মধ্যে বন্ধুসুলভ আচরণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ৯০ শতাংশের বেশি বিদেশি অংশগ্রহণকারী বলেছেন, তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আন্তরিক স্বাগত পেয়েছেন। কিন্তু বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পরিস্থিতি আলাদা। বিশ্বব্যাংকের ‘বিজনেস রেডি ২০২৪’ প্রতিবেদনে নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও কার্যকারিতার দিক থেকে দেশটি নিচের স্তরে রয়েছে।

চীনা ব্যবসায়ীদের অভিযোগগুলো ছিল অত্যন্ত নির্দিষ্ট। খনিজ সম্পদের রয়্যালটি বারবার বাড়ানো, কর তদন্তের নামে কোটি কোটি ডলারের জরিমানা এবং রপ্তানি আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা অন্তত এক বছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে জমা রাখার বাধ্যবাধকতা তাদের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এমনকি কিছু বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারস্থ হতে হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাবও ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। চেম্বারের হিসাব অনুযায়ী, শুধু নিকেল খাতেই চার লাখের বেশি শ্রমিক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। কিছু বড় খনির উৎপাদন কোটা এ বছর ৭০ শতাংশের বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার কারণে আকরিকের দাম প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্লেষকেরা বলছেন, নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণেই রুপিয়াহ দীর্ঘদিন ধরে চাপের মুখে রয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত যে, চীনা বিনিয়োগকারীরা দুর্বল শাসনব্যবস্থা বা ঝুঁকিপূর্ণ বাজারেও সহজে ব্যবসা করতে পারে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার বাস্তবতা দেখাচ্ছে, তারাও স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা চায়। দুর্নীতির চেয়েও অনিশ্চিত নীতিগত পরিবেশ তাদের কাছে বড় সমস্যা হয়ে উঠছে।

চীনা বিনিয়োগের বড় প্রবাহ শুরু হয় ২০১৩ সালে শি জিনপিংয়ের ইন্দোনেশিয়া সফরের পর। স্থানীয় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং সিঙ্গাপুর ও হংকংভিত্তিক বিনিয়োগ চ্যানেলের মাধ্যমে এই অর্থ প্রবেশ করে। ইন্দোনেশিয়ার পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চীনের বিনিয়োগ ছিল ১৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা সিঙ্গাপুরের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সময় ‘হিলিরিসাসি’ বা দেশে খনিজ সম্পদ প্রক্রিয়াজাতকরণের নীতি চালু হয়। সরকার বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ১০ থেকে ১৫ বছরের কর ছাড়, নির্মাণসামগ্রী আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার এবং জমি ব্যবহারে সহজ সুযোগ দেয়। এর ফলে বহু চীনা প্রতিষ্ঠান স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করে।

ফোর্বসের ২০২৩ সালের তালিকা অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার ৫০ ধনী ব্যক্তির সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ২৫২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, এদের ৮৪ শতাংশই চীনা বংশোদ্ভূত ইন্দোনেশীয়। এসব পরিবারের অনেকেই বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকাশ্যে সমর্থনও দিয়েছিলেন।

Chinese investors warn Prabowo over Indonesia policies hurting investment  confidence

এখন সেই দীর্ঘমেয়াদি অংশীদাররাই চাপের মুখে পড়েছেন। রয়্যালটি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ নীতি এবং উৎপাদন কোটা কমানোর মতো সিদ্ধান্ত সরাসরি তাদের ব্যবসায় আঘাত হানছে। অর্থাৎ, এগুলো শুধু বাইরের কোনো স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারীর ওপর প্রভাব ফেলছে না, বরং সরকারের আমন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন বিনিয়োগ করা অংশীদারদেরও সংকটে ফেলছে।

এতে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসেছে—ইন্দোনেশিয়ার আতিথেয়তা আসলে কতটা বাস্তব? বিদেশিদের জন্য যে আন্তরিকতার গল্প প্রচার করা হয়, বাস্তবে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ নিয়ে আসা অংশীদারদের ক্ষেত্রে সেই আচরণ অনেকটাই সীমিত হয়ে যাচ্ছে। চেম্বারের চিঠি মূলত সেই ব্যবধানই তুলে ধরেছে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে বিনিয়োগকারীদের সব দাবি অন্ধভাবে মেনে নিতে হবে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে রেমপাং ইকো-সিটি প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয় জনগণ উচ্ছেদের অভিযোগ সামনে আসে। অনেকের মতে, কিছু চীনা অর্থায়িত প্রকল্প স্থানীয় জনগণের সম্মতি ও স্বার্থকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। আতিথেয়তা মানে পুঁজির কাছে আত্মসমর্পণ নয়।

জাকার্তা-বান্দুং দ্রুতগতির রেল প্রকল্পও একই বাস্তবতার আরেক উদাহরণ। ২০১৫ সালে চীন এই প্রকল্পের কাজ পায় মূলত সরকারি বাজেট ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের মাধ্যমে প্রকল্পটি অর্থায়ন করা হয়। কিন্তু ২০২৩ সালে ব্যয় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাওয়ার পর সরকারকে আংশিক আর্থিক গ্যারান্টি দিতে হয় এবং পরিচালনার মেয়াদ ৫০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়।

এই পরিস্থিতির পেছনে আর্থিক চাপও রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার কর আদায় দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের আশেপাশে আটকে আছে। প্রাবোও সরকারের সামাজিক কর্মসূচির ব্যয় বাড়ায় সরকার সহজ লক্ষ্য হিসেবে সম্পদ রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। কিন্তু বাইরে থেকে এটি হঠাৎ সিদ্ধান্ত ও অস্থির নীতিমালা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ভিয়েতনাম ২০২৪ সালে প্রায় ৩৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ টেনেছে, কারণ দেশটির বিনিয়োগ আইন প্রকল্পভিত্তিক কর সুবিধা পুরো লাইসেন্স মেয়াদজুড়ে নিশ্চিত করে। বিপরীতে ইন্দোনেশিয়ায় নিকেল রয়্যালটি নীতি ও রপ্তানি আয় সংরক্ষণ নীতি এ বছর কোনো পরামর্শ ছাড়াই কার্যকর হয়েছে। এই অনিশ্চয়তার প্রভাব শুধু বিনিয়োগকারীদের নয়, প্রকল্প এলাকার শ্রমিক ও স্থানীয় জনগণের জীবনেও পড়ছে।

ইন্দোনেশিয়া এখনই বড় ধরনের বিনিয়োগ সংকটে পড়েনি। তবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর প্রকাশ্য অভিযোগ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। জাকার্তা এই বার্তাকে কতটা গুরুত্ব দেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।