দুর্যোগের কথা উঠলে সাধারণত আমাদের মনে আসে একটি নির্দিষ্ট সময়ের সংকটের ছবি। একটি ঘটনা ঘটে, ক্ষয়ক্ষতি হয়, তারপর ধীরে ধীরে শুরু হয় পুনর্গঠন। কিন্তু কিছু বিপর্যয় আছে, যেগুলো কখনোই সত্যিকার অর্থে শেষ হয় না। সেগুলো সংবাদ শিরোনাম থেকে হারিয়ে যায়, কিন্তু মানুষের জীবন থেকে নয়। ইন্দোনেশিয়ার লাপিন্দো কাদাপ্রবাহ এমনই এক ঘটনা, যার ক্ষত দুই দশক পরও শুকায়নি।
২০০৬ সালে পূর্ব জাভার সিদোয়ারজো অঞ্চলে শুরু হওয়া এই কাদাপ্রবাহকে অনেকে ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বড় পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করেন। হাজার হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি মাটিচাপা পড়েছে এবং বহু মানুষকে নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হতে হয়েছে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের প্রকৃত গল্প ধ্বংসের পরিসংখ্যানে নয়; বরং সেই দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতায়, যা আজও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
দুই দশক পরও বহু বাসিন্দা নিরাপদ পানির জন্য অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হন। ভূগর্ভস্থ পানির উৎস দূষিত হয়ে যাওয়ায় কূপের পানি আর দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী নেই। যে পানি একসময় জীবনের সহজলভ্য সম্পদ ছিল, তা এখন একটি ব্যয়বহুল প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে। পরিবেশগত ক্ষতির এই দিকটি দেখায় যে একটি দুর্যোগ শেষ হলেও তার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে পারে।
কৃষি খাতেও একই চিত্র। একসময়ের উর্বর জমি এখন অনাবাদি। মাটির গুণগত পরিবর্তন এবং পানির দূষণের কারণে অনেক এলাকায় ফসল ফলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়েছেন পেশা পরিবর্তন করতে। কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায় নেমেছেন, কেউ পরিবহন বা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। কিন্তু জীবিকার এই পরিবর্তন স্বেচ্ছায় নয়; এটি বেঁচে থাকার সংগ্রামের অংশ।
লাপিন্দোর অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রভাব কখনো একমাত্রিক নয়। এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সংকট তৈরি করে। দূষিত বাতাস, দুর্গন্ধ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা এবং ভূমি ধসের মতো ঝুঁকি আজও অনেক মানুষের নিত্যসঙ্গী। বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে, কাদাপ্রবাহের আশপাশের এলাকায় ভূমি ধস দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বেড়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। কোনো দুর্যোগের সফল মোকাবিলা বলতে আমরা কী বুঝি? ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ প্রদান কি যথেষ্ট? নাকি প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও জীবিকার স্থায়ী নিশ্চয়তা ফিরে পায়? লাপিন্দোর ঘটনা দেখায় যে এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
আরও একটি বাস্তবতা হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনমত এবং রাজনৈতিক মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায়। নতুন সংকট পুরোনো সংকটকে আড়াল করে। কিন্তু যারা ক্ষতির মধ্যে বসবাস করে, তাদের কাছে কোনো দুর্যোগই অতীত হয়ে যায় না। বছরের পর বছর প্রতিশ্রুতি ও অপেক্ষার পর অনেক মানুষ প্রতিবাদ করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। তারা সমস্যার সমাধান পান না, বরং সমস্যার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে যান।
এই বাস্তবতা শুধু ইন্দোনেশিয়ার জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। শিল্পায়ন, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার এবং উন্নয়নের পরিকল্পনা যদি যথাযথ জবাবদিহি ও পরিবেশগত সুরক্ষার বাইরে চলে যায়, তাহলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। আর সেই মূল্য অর্থ দিয়ে নয়, জীবনের মান, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দিয়ে পরিশোধ করতে হয়।
লাপিন্দো কাদাপ্রবাহ তাই কেবল একটি অতীতের দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্ন এবং উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য নিয়ে ভাবার একটি সুযোগ। দুই দশক পরও যখন মানুষ একই সমস্যার মধ্যে আটকে থাকে, তখন সেই দুর্যোগকে শেষ হয়ে গেছে বলা যায় না। বরং বলা যায়, এটি এখনও চলছে—কাদার প্রবাহে নয়, মানুষের প্রতিদিনের জীবনে।
Original article by Wahyoe Boediwardhana.
ওয়াহইও বোয়েদিওয়ার্ধানা 



















