০৭:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
শুধু শ্রদ্ধা নয়, শহীদ সেনাদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব এখনই পালন করতে হবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের সতর্কবার্তা: প্রবৃদ্ধি ৩.৫%, মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে নামার শঙ্কা বাগেরহাটে ঘরে মিলল দম্পতির মরদেহ, পাশে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার দেড় মাসের শিশু বিশ্বকাপের পরাজয়ের যন্ত্রণা নয়, অনুভূতিহীনতাই জীবনের সবচেয়ে বড় হার কালেমার পতাকা ইস্যুতে উগ্রবাদী তৎপরতার প্রমাণ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চীনের দল নেই, তবু বিশ্বকাপ জ্বরে উন্মাতাল দেশ; দর্শক, ব্র্যান্ড ও ব্যবসায় নতুন সাফল্যের গল্প বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ১০৮ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ গভীর সমুদ্র থেকে উঠে এলো শ্যাকলটন ও স্কটের ঐতিহাসিক জাহাজের রহস্যময় ছবি যোগব্যায়ামে সূর্যোদয়ের প্রাণশক্তি: সকালের অনুশীলনে মন-শরীরকে সতেজ রাখার সহজ উপায়

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতা: তরুণদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

Students Holding Question Markes, What Kind of Future Could Have?

বহু দেশে তরুণদের বেকারত্ব নিয়ে আলোচনা সাধারণত অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা বা কল্যাণভাতার প্রসঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সমস্যার গভীরে গেলে দেখা যায়, কর্মহীনতার একটি বড় কারণ শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব। তরুণরা বছরের পর বছর শিক্ষা গ্রহণ করছে, ডিগ্রি অর্জন করছে, কিন্তু সেই শিক্ষা তাদের এমন দক্ষতা দিচ্ছে না যা বর্তমান কর্মক্ষেত্র সত্যিই খুঁজছে।

গত এক দশকে কাজের জগৎ আমূল বদলে গেছে। প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয়তা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং নতুন শিল্পক্ষেত্রের বিস্তার কর্মসংস্থানের ধরন পাল্টে দিয়েছে। অথচ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও এমন পাঠক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে, যা অন্য এক সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতার জন্য তৈরি হয়েছিল। ফলাফল হলো, শিক্ষার্থীরা সনদ নিয়ে বের হলেও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতিতে পড়ে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও সক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময়। সবাই একই ধরনের শিক্ষাপদ্ধতিতে সফল হবে—এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে আর খাপ খায় না। কেউ প্রযুক্তিনির্ভর কাজে দক্ষ, কেউ হাতে-কলমে শেখার মাধ্যমে এগিয়ে যায়, কেউ আবার নির্দিষ্ট পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণে দ্রুত সাফল্য পেতে পারে। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ এখনও একই কাঠামো সবার ওপর প্রয়োগ করার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে শিল্প ও ব্যবসা খাতের অভিযোগও উপেক্ষা করা যায় না। প্রকৌশল, উৎপাদন, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন কারিগরি ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় জনবল খুঁজে পাচ্ছে না। একদিকে চাকরিপ্রার্থী তরুণ, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর সংকটে ভোগা প্রতিষ্ঠান—এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে কোথাও না কোথাও ব্যবস্থাগত সমস্যা রয়েছে।

এখানেই কর্মমুখী ও শিল্প-সংযুক্ত শিক্ষার গুরুত্ব সামনে আসে। যখন শিক্ষার্থীরা বাস্তব প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পায়, কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলে, তখন তাদের শেখা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। শিক্ষা তখন শুধু পরীক্ষার ফল নয়; বরং জীবনের জন্য প্রস্তুতির একটি কার্যকর প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

তবে এই পরিবর্তন কেবল বিদ্যালয় বা কলেজের একার দায়িত্ব নয়। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাত—তিন পক্ষকেই সমন্বিতভাবে এগোতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, কারিগরি শিক্ষা এবং বিকল্প পেশাভিত্তিক পথগুলোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বহু ক্ষেত্রে এসব সুযোগ এখনও সীমিত, অপর্যাপ্ত অর্থায়নের শিকার অথবা সামাজিকভাবে কম মূল্যায়িত।

ভবিষ্যতের অর্থনীতি কেমন হবে, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়বে এবং কোন খাত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে—এসব বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট ধারণা সাধারণত ব্যবসা ও শিল্পখাতের কাছেই থাকে। তাই শিক্ষা পরিকল্পনা তৈরির সময় তাদের ভূমিকা আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের কাজ হওয়া উচিত একটি সহায়ক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে উদ্ভাবন ও বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে শিক্ষা বিকশিত হতে পারে।

প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার অভাব। অনেক সময় শিক্ষা সংস্কার রাজনৈতিক মেয়াদের সীমার মধ্যে আটকে যায়, অথচ দক্ষ জনশক্তি তৈরি একটি বহু বছরের প্রক্রিয়া। আজ যে শিক্ষার্থী স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, সে হয়তো ২০৩০-এর দশকের শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। তাই বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতের প্রয়োজন মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে।

তরুণদের কর্মহীনতা নিয়ে উদ্বেগ যথার্থ। কিন্তু কেবল পরিসংখ্যান বা কল্যাণমূলক সহায়তা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। যদি শিক্ষা ব্যবস্থা কর্মজগতের বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত না হয়, তবে আরও বেশি তরুণ হতাশার মুখোমুখি হবে। আর যদি সেই সংযোগ গড়ে তোলা যায়, তবে একই তরুণরাই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

এই কারণেই শিক্ষা সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল বিদ্যালয়ের নয়; এটি অর্থনীতি, সামাজিক অগ্রগতি এবং আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রশ্ন।

জনপ্রিয় সংবাদ

শুধু শ্রদ্ধা নয়, শহীদ সেনাদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব এখনই পালন করতে হবে

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতা: তরুণদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

০৭:০৬:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

বহু দেশে তরুণদের বেকারত্ব নিয়ে আলোচনা সাধারণত অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা বা কল্যাণভাতার প্রসঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সমস্যার গভীরে গেলে দেখা যায়, কর্মহীনতার একটি বড় কারণ শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব। তরুণরা বছরের পর বছর শিক্ষা গ্রহণ করছে, ডিগ্রি অর্জন করছে, কিন্তু সেই শিক্ষা তাদের এমন দক্ষতা দিচ্ছে না যা বর্তমান কর্মক্ষেত্র সত্যিই খুঁজছে।

গত এক দশকে কাজের জগৎ আমূল বদলে গেছে। প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয়তা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং নতুন শিল্পক্ষেত্রের বিস্তার কর্মসংস্থানের ধরন পাল্টে দিয়েছে। অথচ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও এমন পাঠক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে, যা অন্য এক সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতার জন্য তৈরি হয়েছিল। ফলাফল হলো, শিক্ষার্থীরা সনদ নিয়ে বের হলেও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতিতে পড়ে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও সক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময়। সবাই একই ধরনের শিক্ষাপদ্ধতিতে সফল হবে—এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে আর খাপ খায় না। কেউ প্রযুক্তিনির্ভর কাজে দক্ষ, কেউ হাতে-কলমে শেখার মাধ্যমে এগিয়ে যায়, কেউ আবার নির্দিষ্ট পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণে দ্রুত সাফল্য পেতে পারে। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ এখনও একই কাঠামো সবার ওপর প্রয়োগ করার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে শিল্প ও ব্যবসা খাতের অভিযোগও উপেক্ষা করা যায় না। প্রকৌশল, উৎপাদন, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন কারিগরি ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় জনবল খুঁজে পাচ্ছে না। একদিকে চাকরিপ্রার্থী তরুণ, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর সংকটে ভোগা প্রতিষ্ঠান—এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে কোথাও না কোথাও ব্যবস্থাগত সমস্যা রয়েছে।

এখানেই কর্মমুখী ও শিল্প-সংযুক্ত শিক্ষার গুরুত্ব সামনে আসে। যখন শিক্ষার্থীরা বাস্তব প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পায়, কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলে, তখন তাদের শেখা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। শিক্ষা তখন শুধু পরীক্ষার ফল নয়; বরং জীবনের জন্য প্রস্তুতির একটি কার্যকর প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

তবে এই পরিবর্তন কেবল বিদ্যালয় বা কলেজের একার দায়িত্ব নয়। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাত—তিন পক্ষকেই সমন্বিতভাবে এগোতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, কারিগরি শিক্ষা এবং বিকল্প পেশাভিত্তিক পথগুলোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বহু ক্ষেত্রে এসব সুযোগ এখনও সীমিত, অপর্যাপ্ত অর্থায়নের শিকার অথবা সামাজিকভাবে কম মূল্যায়িত।

ভবিষ্যতের অর্থনীতি কেমন হবে, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়বে এবং কোন খাত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে—এসব বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট ধারণা সাধারণত ব্যবসা ও শিল্পখাতের কাছেই থাকে। তাই শিক্ষা পরিকল্পনা তৈরির সময় তাদের ভূমিকা আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের কাজ হওয়া উচিত একটি সহায়ক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে উদ্ভাবন ও বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে শিক্ষা বিকশিত হতে পারে।

প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার অভাব। অনেক সময় শিক্ষা সংস্কার রাজনৈতিক মেয়াদের সীমার মধ্যে আটকে যায়, অথচ দক্ষ জনশক্তি তৈরি একটি বহু বছরের প্রক্রিয়া। আজ যে শিক্ষার্থী স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, সে হয়তো ২০৩০-এর দশকের শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। তাই বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতের প্রয়োজন মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে।

তরুণদের কর্মহীনতা নিয়ে উদ্বেগ যথার্থ। কিন্তু কেবল পরিসংখ্যান বা কল্যাণমূলক সহায়তা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। যদি শিক্ষা ব্যবস্থা কর্মজগতের বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত না হয়, তবে আরও বেশি তরুণ হতাশার মুখোমুখি হবে। আর যদি সেই সংযোগ গড়ে তোলা যায়, তবে একই তরুণরাই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

এই কারণেই শিক্ষা সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল বিদ্যালয়ের নয়; এটি অর্থনীতি, সামাজিক অগ্রগতি এবং আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রশ্ন।