কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনার নাম নয়; এটি ইতোমধ্যেই আমাদের অর্থনীতি, প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রযুক্তিটির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে এসেছে—আইন কি উদ্ভাবনকে পথ দেখাবে, নাকি উদ্ভাবন ঘটার পর তার ঝুঁকি মোকাবিলায় হস্তক্ষেপ করবে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন উত্তর খুঁজছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো গড়ে তুলেছে। চীন নির্দিষ্ট এআই প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদমকে কেন্দ্র করে আলাদা বিধিনিষেধ তৈরি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে শিথিল নীতি অনুসরণ করে উদ্ভাবনের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—এআইয়ের বিকাশের সঙ্গে আস্থা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
ভারতের মতো দেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন ব্যাংকিং, পরিচয়ব্যবস্থা, সরকারি সেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক এআই নির্দেশিকায় ভারত বিদ্যমান আইন ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছে। পাশাপাশি শিল্পখাতের আচরণবিধি, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত যাচাইব্যবস্থার মতো উপায়ও প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে কেবল স্বনিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরতা সবসময় যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত স্বয়ংক্রিয় সক্ষমতাসম্পন্ন কিছু এআই প্রযুক্তি সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। এ ধরনের প্রযুক্তি একদিকে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে, অন্যদিকে অপব্যবহারের মাধ্যমে বড় ধরনের ক্ষতির কারণও হতে পারে। ফলে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং খোলামেলা আলোচনা যতটা প্রয়োজন, ততটাই প্রয়োজন একটি কার্যকর আইনগত কাঠামো।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব ধরনের এআই ব্যবহারের জন্য একই মাত্রার নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয় না। গ্রাহকসেবায় ব্যবহৃত একটি চ্যাটবট এবং রোবটিক সার্জারিতে ব্যবহৃত একটি এআই ব্যবস্থার ঝুঁকি এক নয়। তাই ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী স্তরভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। চিকিৎসা প্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে। সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার, কার্যকারিতা এবং বাস্তব পরিবেশে তার আচরণ নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহি। কোনো এআই ব্যবস্থা যত উন্নতই হোক না কেন, আইনি দায়ভার মানুষের হাতেই থাকতে হবে। প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয়তা যেন দায়িত্বহীনতার সুযোগ তৈরি না করে, সেজন্য উন্নয়নকারী, ব্যবহারকারী এবং পরিচালনাকারীর ভূমিকা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে মানব তদারকি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত এবং প্রয়োজনে মানুষ যেন সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এআইয়ের প্রভাব জাতীয় সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। তাই শুধুমাত্র একটি দেশের আইন দিয়ে এর সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যূনতম কিছু অভিন্ন নীতি ও সমন্বিত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। যদিও বৈশ্বিক বাধ্যতামূলক আইন দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম, তবু সমন্বিত আলোচনা ও সহযোগিতা ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামবে না। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা যাতে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে এবং সমাজের আস্থা অর্জন করে, সেজন্য প্রয়োজন স্পষ্ট, অভিযোজনক্ষম ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কেন্দ্রে মানুষকে রাখার মধ্যেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় নীতিগত দায়িত্ব নিহিত।
আর ভি অনুরাধা ক্লারাস ল অ্যাসোসিয়েটস, নয়াদিল্লির অংশীদার। মন্দিরা শাহ ডিজিটাল রূপান্তর ও তথ্যবিজ্ঞানবিষয়ক পরামর্শক। এই লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকদের নিজস্ব।
আর ভি অনুরাধা ও মন্দিরা শাহ 


















