বিশ্ব রাজনীতিতে সামরিক শক্তির আলোচনা সাধারণত যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান বা সেনাসংখ্যাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, আধুনিক প্রতিরোধক্ষমতার আসল ভিত্তি হয়তো অন্য কোথাও। যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ব্যবহার করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সেই অস্ত্র দ্রুত পুনরায় তৈরি ও সরবরাহ করার সক্ষমতা।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ভারসাম্য নিয়ে যে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা এসে দাঁড়িয়েছে। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে এবং নিজস্ব সামরিক শিল্পকে শক্তিশালী করতে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের শিল্পভিত্তিক সীমাবদ্ধতাই মিত্র দেশগুলোর আধুনিকায়ন পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে উঠছে।
অস্ত্রের ঘাটতি শুধু সরঞ্জামের সমস্যা নয়
জাপানের দীর্ঘপাল্লার টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ পরিকল্পনায় বিলম্বের খবর এই সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিষয়টি কেবল একটি অস্ত্রচুক্তির দেরি নয়; এটি বৃহত্তর একটি কাঠামোগত সমস্যার লক্ষণ। সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন নিজের মজুত পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নির্ভুল আঘাত হানার বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও একই চাপ তৈরি হয়েছে।
এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: কোনো দেশ কি শুধু বর্তমান সামরিক শক্তির ভিত্তিতে নিরাপদ থাকতে পারে, যদি সে দীর্ঘমেয়াদে সেই শক্তি ধরে রাখার শিল্পসামর্থ্য না রাখে?
কারখানা গড়তে সময় লাগে, যুদ্ধ অপেক্ষা করে না
সামরিক উৎপাদনের জগৎ রাজনৈতিক ঘোষণার গতিতে চলে না। নতুন কারখানা স্থাপন, দক্ষ শ্রমিক তৈরি, সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলা এবং উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণ—সবকিছুই বহু বছরের প্রক্রিয়া। অথচ নিরাপত্তা সংকট বা সম্ভাব্য সংঘাত অনেক দ্রুত তৈরি হতে পারে।
সমস্যার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অনিয়মিত ক্রয়নীতি, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন খাতে বছরের পর বছর অপর্যাপ্ত মনোযোগ। যখন শিল্পপ্রতিষ্ঠান জানে না আগামী কয়েক বছর তাদের কাছে কী পরিমাণ অর্ডার আসবে, তখন তারা নতুন অবকাঠামো বা জনশক্তিতে বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করে। ফলাফল হিসেবে সামরিক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ দক্ষতাও ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
প্রতিরোধক্ষমতা এখন যৌথ প্রকল্প
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—কোনো দেশ একা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ফিলিপাইন—প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু আলাদা আলাদা প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতাও আছে।
সেই কারণেই সামরিক জোটের ধারণা এখন কেবল যৌথ মহড়া বা গোয়েন্দা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে যৌথ উৎপাদন, সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক শিল্প নেটওয়ার্ক। অস্ত্র কোথায় তৈরি হবে, যন্ত্রাংশ কোথা থেকে আসবে, রক্ষণাবেক্ষণ কোথায় হবে—এসব প্রশ্ন এখন কৌশলগত আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
নিরাপত্তার নতুন সংজ্ঞা
দীর্ঘদিন ধরে সামরিক শক্তিকে মূলত প্ল্যাটফর্মভিত্তিক দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে—কার কাছে কত উন্নত অস্ত্র আছে। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে অন্য একটি মানদণ্ড: কারা দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন, সরবরাহ এবং যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে।
একটি আধুনিক যুদ্ধ শুধু প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা নয়; এটি শিল্প, অর্থনীতি এবং সংগঠনেরও প্রতিযোগিতা। যে রাষ্ট্র বা জোট দ্রুত ক্ষয়পূরণ করতে পারবে, উৎপাদন বাড়াতে পারবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে পারবে, শেষ পর্যন্ত তারাই কৌশলগত সুবিধা পাবে।
সেই অর্থে ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি কেবল সামরিক সংকেত নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিরোধক্ষমতা ভবিষ্যতে নির্ভর করবে শুধু কে কত অস্ত্র কিনছে তার ওপর নয়, বরং কে কত দ্রুত এবং কত সমন্বিতভাবে সেই অস্ত্র তৈরি ও পুনরায় সরবরাহ করতে পারছে তার ওপর। আধুনিক নিরাপত্তার যুগে শিল্পভিত্তিক সহযোগিতা আর অর্থনৈতিক নীতি নয়—এটি ক্রমশ জাতীয় প্রতিরক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হচ্ছে।
ব্র্যাড গ্লসারম্যান 


















