ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বড় পরিবর্তন সাধারণত স্বস্তির সময়ে আসে না। অর্থনৈতিক চাপ, নিরাপত্তা সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা সামাজিক হতাশা— এসবই প্রায়শই রাষ্ট্রকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যা শান্ত সময়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। ইউরোপের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। অথচ ব্রিটেন যেন এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সমস্যাগুলো দৃশ্যমান হলেও সেগুলো মোকাবিলার জরুরি তাগিদটি অনুপস্থিত।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠিত হচ্ছে, প্রযুক্তি অর্থনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে, নিরাপত্তা হুমকির ধরন বদলে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে একটি দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো নিজেকে কেন্দ্র করে চিন্তা করা এবং বাইরের বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া।
ব্রিটেনের সামনে আজ ঠিক সেই চ্যালেঞ্জ। দেশটি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে চীনের উত্থানকে সন্দেহের চোখে দেখে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কেও দ্বিধা রয়েছে। ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলাফল হলো, বৈশ্বিক পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকার পরিবর্তে ব্রিটেন ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অবস্থানই একমাত্র সমস্যা নয়। দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও উদ্বেগজনক। উচ্চ জ্বালানি ব্যয় নতুন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্পে প্রতিযোগিতা কঠিন করে তুলছে। স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও কার্যকর অগ্রগতি সীমিত। রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রায়শই দৈনন্দিন বিতর্কে ব্যস্ত থাকায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ইউরোপের কিছু দেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। কয়েক দশক আগে যেসব রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, অদক্ষ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হতো, তাদের অনেকেই আজ নতুন সাফল্যের উদাহরণ। পোল্যান্ডের রূপান্তর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সোভিয়েত প্রভাবমুক্ত হওয়ার পর দেশটি শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেনি, বরং কাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেকে পুনর্গঠন করেছে। নিরাপত্তা হুমকিকে তারা কেবল ভয়ের বিষয় হিসেবে নয়, প্রস্তুতির প্রেরণা হিসেবেও ব্যবহার করেছে।
একই ধরনের গল্প দেখা যায় গ্রিস, আয়ারল্যান্ড ও স্পেনে। দুই দশক আগে আর্থিক সংকট এসব দেশের অর্থনীতি প্রায় ভেঙে ফেলেছিল। বেকারত্ব বেড়েছিল, জীবনযাত্রার মান কমেছিল এবং কঠোর ব্যয়সংকোচন নীতির কারণে রাজনৈতিক অস্থিরতাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সংকটই শেষ পর্যন্ত সংস্কারের পথ খুলে দেয়। প্রশাসনিক আধুনিকীকরণ, বাজেট শৃঙ্খলা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার করেছে নিজেদের অবস্থান।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব দেশের সাফল্য কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। তারা সংকট থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে একই ভুল এড়াতে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলেছে। অর্থনৈতিক কষ্ট তাদের বাধ্য করেছে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে। সেই সিদ্ধান্তগুলো জনপ্রিয় ছিল না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ফল দিয়েছে।
ব্রিটেনের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। দেশটির সমস্যা এখনো এত তীব্র নয় যে তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের অনুভূতি তৈরি করবে। কিন্তু ঠিক এই কারণেই প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। যখন বিপদ স্পষ্টভাবে দরজায় কড়া নাড়ে না, তখন রাজনৈতিক নেতৃত্বও প্রায়শই সহজ পথ বেছে নেয়। স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তা দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
বিশ্ব অর্থনীতি, নিরাপত্তা পরিবেশ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতি বিবেচনায় এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার— সবকিছুই আগামী দশকের প্রতিযোগিতার কাঠামো বদলে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় যে দেশগুলো আগেভাগে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে।
প্রশ্ন হলো, ব্রিটেন কি সংকট আসার আগেই পরিবর্তনের পথে হাঁটবে, নাকি অন্যদের মতো বড় ধাক্কার অপেক্ষা করবে? ইতিহাসের সাম্প্রতিক উদাহরণগুলো বলছে, সংস্কারের মূল্য সবসময়ই আছে। কিন্তু সংস্কার বিলম্বিত করার মূল্য অনেক সময় আরও বেশি হয়।
আজ ইউরোপের যে দেশগুলোকে নতুন উদ্যমের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে, তারা একসময় ছিল সতর্কবার্তার উদাহরণ। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায়, সংকট কখনও কখনও পুনর্জাগরণের সূচনা করতে পারে। তবে সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রগুলো সেই শিক্ষা নেয় বিপর্যয়ের পরে নয়, তার আগেই। ব্রিটেনের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই।
মূল লেখক: Peter Frankopan। এই বাংলা নিবন্ধটি তাঁর মূল বিশ্লেষণের ভাবনা, যুক্তি ও কেন্দ্রীয় তর্ক অনুসরণ করে নতুনভাবে রচিত।
পিটার ফ্রাঙ্কোপান 


















