দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তার এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিস্ময়কর উত্থান দেশটিকে নতুন প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে গেছে। রপ্তানি বেড়েছে, করপোরেট মুনাফা লাফিয়ে উঠেছে, শেয়ারবাজার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। উপরিভাগ থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কোরিয়া এক নতুন অর্থনৈতিক স্বর্ণযুগে প্রবেশ করেছে।
কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির উজ্জ্বল পরিসংখ্যান সব সময় মানুষের বাস্তব জীবনকে প্রতিফলিত করে না। অনেক সময় প্রবৃদ্ধির গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে বৈষম্যের গল্প। দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
দেশটির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল রপ্তানি। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর খাতের অসাধারণ সাফল্য পুরো অর্থনীতিকে সামনে টেনে নিয়েছে। বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং এআই-নির্ভর বিনিয়োগের ফলে কোরিয়ার বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিপুল সুবিধা পেয়েছে। জাহাজ নির্মাণ, প্রতিরক্ষা শিল্প, বায়োটেকনোলজি এবং কিছু উন্নত উৎপাদন খাতও এই প্রবৃদ্ধির অংশ হয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো, এই সাফল্যের সুফল কারা পাচ্ছে?
অর্থনীতির কেন্দ্রীয় সূচকগুলো উন্নতির কথা বললেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্বনিযুক্ত কর্মী এবং সেবা খাতের অনেক মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। বিপুল সংখ্যক ছোট ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে, ঋণখেলাপির ঝুঁকি বেড়েছে এবং স্থানীয় অর্থনীতির অনেক অংশ এখনও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় অর্থনীতি এগোলেও সমাজের একটি বড় অংশ সেই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
এই ব্যবধান শুধু ব্যবসা বা আয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমবাজারেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট। বড় করপোরেশনের কর্মীরা তুলনামূলকভাবে উচ্চ বেতন, বোনাস এবং চাকরির নিরাপত্তা ভোগ করছেন। অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা একই ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। একই দেশের শ্রমবাজারের ভেতরেই যেন দুটি আলাদা বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
যুবকদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও অনেক তরুণ এখনও স্থিতিশীল কর্মসংস্থান খুঁজে পাচ্ছেন না। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি ফাঁক তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অসন্তোষ বাড়াতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পদ বৈষম্য। আবাসনমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং শেয়ারবাজারের উত্থান সম্পদধারী জনগোষ্ঠীকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু যাদের কাছে পর্যাপ্ত সম্পদ নেই, তারা এই প্রবৃদ্ধির সুবিধা খুব কমই পেয়েছে। ফলে আয় বৈষম্যের পাশাপাশি সম্পদ বৈষম্যও গভীরতর হচ্ছে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বর্তমান উত্থান এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যখন রেকর্ড মুনাফা অর্জন করছে, তখন সেই মুনাফার কতটা সমাজের বৃহত্তর অংশে পৌঁছাচ্ছে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। কারণ একটি শিল্পের সাফল্য শুধু কোম্পানির নিজস্ব দক্ষতার ফল নয়; এর পেছনে থাকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক, স্থানীয় অবকাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় নীতিগত সহায়তা।
তবু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে সীমিত সংখ্যক শেয়ারধারী ও মূল কর্মীদের হাতে। অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণে যারা ভূমিকা রাখছে, তাদের অনেকেই সেই সাফল্যের সমান অংশীদার হতে পারছে না।
এই পরিস্থিতি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেশটি কি এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলবে, যেখানে প্রবৃদ্ধির সুফল বিস্তৃতভাবে ভাগ হবে? নাকি এমন একটি কাঠামোর দিকে এগোবে, যেখানে অল্প কয়েকটি খাত ও গোষ্ঠী সমৃদ্ধ হবে এবং বাকিরা পিছিয়ে থাকবে?
সমাধানের পথ পুরোপুরি অজানা নয়। শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো, অনিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের সুরক্ষা জোরদার করা এবং ছোট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে কর ও সামাজিক ব্যয়ের মাধ্যমে বৈষম্য কমানোর আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত অর্থনীতিতে শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; সেই প্রবৃদ্ধি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক সাফল্য তখনই টেকসই হয়, যখন তার ফল সমাজের বিস্তৃত অংশের কাছে পৌঁছে।
আজকের কোরিয়া সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান দেশটিকে নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনা যদি কেবল সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তবে অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি বৈষম্যের নতুন এক অধ্যায়ও রচিত হবে। আর তখন প্রবৃদ্ধির গল্প যতই আকর্ষণীয় হোক, সমাজের বাস্তবতা হয়ে উঠবে অনেক বেশি বিভক্ত এবং অস্থির।
কাং-কুক লি 









