এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই নিশ্চয়ই শুনেছেন যে, দেশটির উন্নয়ন খাতে ৭০ কোটিরও বেশি মার্কিন ডলারের সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে ইউএসএআইডি। এর ফলে দেশে ৫০ হাজারেরও বেশি উন্নয়নকর্মীর চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশনও ২০২৮ সালের মধ্যে তাদের দ্বিপাক্ষিক কর্মসূচি গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সেই দীর্ঘদিনের লক্ষ্যমাত্রা—যেখানে উন্নত দেশগুলোকে তাদের মোট জাতীয় আয়ের অন্তত ০.৭ শতাংশ সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) হিসেবে ব্যয় করার আহ্বান জানানো হয়েছিল—২০২৫ সালে মাত্র চারটি দেশ পূরণ করেছে। বিপরীতে, ২৫টি দেশ তাদের উন্নয়ন সহায়তা কমিয়েছে, যার ফলে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মোট ওডিএ প্রবাহ ২৩ শতাংশ কমে গেছে।
অর্থনৈতিক মন্দা ও অগ্রাধিকারের পরিবর্তন
এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ মনে করেন, কোভিড-পরবর্তী মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং যুদ্ধের ব্যয়বৃদ্ধি এর জন্য দায়ী। অন্যদের মতে, দাতা দেশগুলো এখন তাদের সীমিত সম্পদ আফ্রিকার আরও দরিদ্র দেশগুলোর দিকে সরিয়ে নিচ্ছে, কারণ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে।
আবার কেউ কেউ ধারণা করেন, ইউক্রেন, ফিলিস্তিন বা রোহিঙ্গা সংকটের মতো মানবিক বিপর্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তার অগ্রাধিকার বদলে গেছে। ফলে উন্নয়ন সহায়তার জন্য প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র হয়েছে।
চাকরির সংকট
বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে উন্নয়ন খাতের কর্মসংস্থানে। অনেক সংস্থা কর্মী ছাঁটাই, পদাবনতি এবং বেতন কমানোর পথ বেছে নিয়েছে। একই সঙ্গে কাজের একটি অংশ আউটসোর্সিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ব্যবস্থায় স্থানান্তর করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ মনে করেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রথমে নিজেদের দেশের কর্মীদের চাকরি রক্ষার চেষ্টা করছে। আবার কেউ দেখছেন, ব্যয় কমাতে জাতীয় পর্যায়ের কর্মীদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
যেসব কর্মী ইতোমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন কিংবা অনিশ্চিত চুক্তির মধ্যে রয়েছেন, তাদের সামনে নতুন দক্ষতা অর্জন, পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানো অথবা বেসরকারি খাতে প্রবেশের মতো বিকল্প পথ রয়েছে। কেউ কেউ আবার আফগানিস্তান বা দক্ষিণ সুদানের মতো কঠিন ও সংকটাপন্ন অঞ্চলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বা মানবিক সহায়তার কাজে যোগ দেওয়ার সুযোগও বিবেচনা করছেন।
টিকে থাকার কৌশল
দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো বিভিন্ন ধরনের কৌশল গ্রহণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয়করণ, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং সামাজিক ব্যবসা বা সামাজিক উদ্যোগভিত্তিক মডেল গড়ে তোলা।
স্থানীয়করণ ও আঞ্চলিকীকরণ
‘লোকালাইজেশন’ বা স্থানীয়করণ এখন উন্নয়ন খাতের অন্যতম আলোচিত ধারণা। জাতীয় ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার নামে যে প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, তার পেছনে ব্যয় সাশ্রয়ের একটি বাস্তব কারণও রয়েছে।
একসময় আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো মূলত অর্থ সংগ্রহ ও বিতরণের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। কিন্তু এখন তারা কেবল অর্থদাতা বা তদারককারী নয়; বরং জাতীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে একই অর্থায়নের জন্য প্রতিযোগিতাও করছে।
ফলে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করছে। কেউ কেউ নিজেদের পরিচালন কাঠামো জাতীয় পর্যায়ে রূপান্তর করেছে। আবার অন্যরা অংশীদারনির্ভর কার্যক্রম পরিচালনার মডেলে চলে গেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে একাধিক কার্যক্রমকে একত্রিত করে ব্যয় কমানোর উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে।
এছাড়া অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন এমন ক্ষেত্রগুলোতে বেশি মনোযোগ দিতে চাইছে, যেখানে তাদের তুলনামূলক দক্ষতা বেশি—যেমন গবেষণা, প্রচারাভিযান, নীতি-আলোচনা ও অ্যাডভোকেসি। অন্যদিকে, সরাসরি সেবাদানমূলক কার্যক্রম স্থানীয় সংগঠনগুলো আরও কম খরচে পরিচালনা করতে পারে বলে তারা মনে করছে।
সাংগঠনিক পুনর্গঠন
অনেক সংস্থা নিজেদের কার্যক্রমের ধরন নতুন করে মূল্যায়ন করছে। কেউ সরাসরি সেবা প্রদান অব্যাহত রাখছে, আবার কেউ অংশীদারনির্ভর পদ্ধতিতে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান সুবিধাভোগীদের আরও কাছাকাছি অবস্থান থেকে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় কাজ করা অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে কক্সবাজার সদর থেকে উখিয়ার মতো এলাকায় কার্যক্রম স্থানান্তর করেছে, যাতে ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কার্যকারিতাও বাড়ানো যায়।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে মানবসম্পদ, প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সেবা একত্রে ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যয় সাশ্রয়ের কৌশল অনুসরণ করছে।

অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করা
উন্নয়ন খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো অর্থায়নের নতুন উৎস খোঁজা। আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতীয় এনজিও এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলো এখন শুধু প্রচলিত দাতা দেশগুলোর ওপর নির্ভর করছে না। তারা সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং বিভিন্ন অংশীদারিত্বভিত্তিক উদ্যোগের দিকেও নজর দিচ্ছে।
করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা, যৌথ অর্থায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মতো মডেল ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে বেসরকারি খাতের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই না হলে সমালোচনার মুখেও পড়তে হচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠানকে।
একই সময়ে অনেক এনজিও পরামর্শকসেবা ও অন্যান্য আয়মুখী কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছে। আবার ক্ষুদ্রঋণ বা ক্ষুদ্র অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো তুলনামূলকভাবে আর্থিকভাবে বেশি স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
ব্যক্তিগত অনুদান, জনসম্পৃক্ত তহবিল সংগ্রহ এবং ক্রাউডফান্ডিং মডেলও ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
সামাজিক উদ্যোগ ও সামাজিক ব্যবসা
সামাজিক ব্যবসা এবং সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনাম রয়েছে।
দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও সামাজিক উদ্যোগভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। কারণ তারা উপলব্ধি করছে যে, শুধুমাত্র অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
ব্যবসা খাতের মতো উন্নয়ন খাতকেও নতুন সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে—যেখানে সীমিত সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা না করে উদ্ভাবনী উপায়ে নতুন মূল্য সৃষ্টি করা যায়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, মানুষ কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অর্থ দেয় না; তারা অর্থ দেয় সেই প্রতিষ্ঠানের বাস্তব প্রভাব ও পরিবর্তন সৃষ্টির ক্ষমতার জন্য। উন্নয়ন খাতের ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সেই সক্ষমতার ওপরই।
মেহজাবিন আহমেদ 


















