০৬:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬
আমির খানের জীবনে নতুন অধ্যায়, ৫ জুলাই গৌরী স্প্র্যাটকে বিয়ে করছেন বলিউড তারকা কলমের কাছে ফিরে যাওয়ার সময় কি এসে গেছে? শিক্ষাব্যবস্থার সংকট: নম্বরের খাতা নয়, বদলাতে হবে শেখার ভিত্তি দারিদ্র্য অর্থায়ন: সংকট থেকে টেকসইতার পথে? মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ: আধিপত্যের রাজনীতি নাকি আঞ্চলিক আত্মনির্ধারণ? তোফায়েল আহমেদের জানাজায় জনসমুদ্র, স্মৃতি আর এক যুগের অবসান চীনের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি পুনর্বিবেচনায় সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, নতুন প্রধানমন্ত্রীর ইঙ্গিত বাংলাদেশি পণ্যে অতিরিক্ত ১০% শুল্কের প্রস্তাব, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নতুন চাপে রপ্তানি খাত সাতক্ষীরা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে আহত দুই বাংলাদেশি শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং সুবিধাভোগীদের চিরন্তন পলায়নপথ

মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ: আধিপত্যের রাজনীতি নাকি আঞ্চলিক আত্মনির্ধারণ?

মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বরাজনীতির অন্যতম অস্থির অঞ্চল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করছে, এই অঞ্চলের সংঘাতগুলো কেবল সীমান্ত, নিরাপত্তা বা ধর্মীয় বিভাজনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এখানে একটি বৃহত্তর শক্তির লড়াই চলছে—একদিকে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রভাবব্যবস্থা, অন্যদিকে সেই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো আঞ্চলিক শক্তিগুলো।

গাজা ও লেবাননে সামরিক অভিযান, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং নতুন কূটনৈতিক জোটগুলোর উত্থান মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়বে না। এগুলো আসলে অঞ্চলটির ক্ষমতার কাঠামো পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাব কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান বহিরাগত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। জ্বালানি সম্পদের গুরুত্ব, সমুদ্রপথের কৌশলগত অবস্থান এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অঞ্চলটির ভূমিকা ওয়াশিংটনকে এখানে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামরিক উপস্থিতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে এমন একটি কাঠামো গড়ে ওঠে, যা বহু দেশের নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

কিন্তু কোনো আধিপত্যই চ্যালেঞ্জহীন থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যে সেই চ্যালেঞ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে ইরান। দেশটি শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে, যা বহিরাগত প্রভাবনির্ভর আঞ্চলিক ব্যবস্থার বিকল্প ধারণা তুলে ধরে। ফলে ইরানকে ঘিরে বিরোধ কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি বা নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রশ্ন নয়; এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

The future trajectories of the Middle East | Column

অন্যদিকে, আরব বিশ্বের কিছু দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সমর্থকেরা এটিকে স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তবে সমালোচকদের মতে, ফিলিস্তিনি জনগণের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

একই সময়ে নতুন অর্থনৈতিক করিডর, আঞ্চলিক জোট এবং অবকাঠামো প্রকল্পগুলোও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠেছে। উন্নয়নের ভাষায় উপস্থাপিত এসব উদ্যোগের ভেতরে কৌশলগত হিসাবও কাজ করছে। ফলে অঞ্চলটি এখন শুধু তেল ও গ্যাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের একটি কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র।

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও একে রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না। নিষেধাজ্ঞা, চাপ কিংবা সামরিক অভিযান কোনো রাষ্ট্রকে সাময়িকভাবে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আসে কূটনৈতিক সমঝোতা এবং পারস্পরিক স্বীকৃতির মাধ্যমে।

আজকের মধ্যপ্রাচ্যের সামনে তাই মৌলিক প্রশ্ন হলো—অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ কি বহিরাগত শক্তির নিরাপত্তা কাঠামো দ্বারা নির্ধারিত হবে, নাকি আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ ও বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন পথ নির্মাণ করবে? উত্তরটি সহজ নয়। কারণ ঐতিহাসিক বিরোধ, পারস্পরিক সন্দেহ এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এখনও গভীরভাবে বিদ্যমান।

তবু বাস্তবতা হলো, যদি আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ ও সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা বহিরাগত শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবেই থেকে যাবে। বিপরীতে, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ পরিহার, বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্ভব।

সেই পথ সহজ নয়। বর্তমান শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিরোধের মুখে পড়বে। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো অঞ্চল দীর্ঘদিন অন্যের কৌশলগত স্বার্থের ওপর নির্ভর করে টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের গভীরে তাই শুধু যুদ্ধের প্রশ্ন নেই; রয়েছে রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। অঞ্চলটির জনগণ ও রাষ্ট্রগুলো কি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণ করবে, নাকি বহিরাগত শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে থাকবে—আগামী বছরগুলোতে সেই প্রশ্নের উত্তরই মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা গড়ে দেবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আমির খানের জীবনে নতুন অধ্যায়, ৫ জুলাই গৌরী স্প্র্যাটকে বিয়ে করছেন বলিউড তারকা

মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ: আধিপত্যের রাজনীতি নাকি আঞ্চলিক আত্মনির্ধারণ?

০৫:১৩:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বরাজনীতির অন্যতম অস্থির অঞ্চল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করছে, এই অঞ্চলের সংঘাতগুলো কেবল সীমান্ত, নিরাপত্তা বা ধর্মীয় বিভাজনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এখানে একটি বৃহত্তর শক্তির লড়াই চলছে—একদিকে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রভাবব্যবস্থা, অন্যদিকে সেই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো আঞ্চলিক শক্তিগুলো।

গাজা ও লেবাননে সামরিক অভিযান, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং নতুন কূটনৈতিক জোটগুলোর উত্থান মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়বে না। এগুলো আসলে অঞ্চলটির ক্ষমতার কাঠামো পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাব কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান বহিরাগত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। জ্বালানি সম্পদের গুরুত্ব, সমুদ্রপথের কৌশলগত অবস্থান এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অঞ্চলটির ভূমিকা ওয়াশিংটনকে এখানে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামরিক উপস্থিতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে এমন একটি কাঠামো গড়ে ওঠে, যা বহু দেশের নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

কিন্তু কোনো আধিপত্যই চ্যালেঞ্জহীন থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যে সেই চ্যালেঞ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে ইরান। দেশটি শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে, যা বহিরাগত প্রভাবনির্ভর আঞ্চলিক ব্যবস্থার বিকল্প ধারণা তুলে ধরে। ফলে ইরানকে ঘিরে বিরোধ কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি বা নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রশ্ন নয়; এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

The future trajectories of the Middle East | Column

অন্যদিকে, আরব বিশ্বের কিছু দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সমর্থকেরা এটিকে স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তবে সমালোচকদের মতে, ফিলিস্তিনি জনগণের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

একই সময়ে নতুন অর্থনৈতিক করিডর, আঞ্চলিক জোট এবং অবকাঠামো প্রকল্পগুলোও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠেছে। উন্নয়নের ভাষায় উপস্থাপিত এসব উদ্যোগের ভেতরে কৌশলগত হিসাবও কাজ করছে। ফলে অঞ্চলটি এখন শুধু তেল ও গ্যাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের একটি কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র।

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও একে রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না। নিষেধাজ্ঞা, চাপ কিংবা সামরিক অভিযান কোনো রাষ্ট্রকে সাময়িকভাবে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আসে কূটনৈতিক সমঝোতা এবং পারস্পরিক স্বীকৃতির মাধ্যমে।

আজকের মধ্যপ্রাচ্যের সামনে তাই মৌলিক প্রশ্ন হলো—অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ কি বহিরাগত শক্তির নিরাপত্তা কাঠামো দ্বারা নির্ধারিত হবে, নাকি আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ ও বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন পথ নির্মাণ করবে? উত্তরটি সহজ নয়। কারণ ঐতিহাসিক বিরোধ, পারস্পরিক সন্দেহ এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এখনও গভীরভাবে বিদ্যমান।

তবু বাস্তবতা হলো, যদি আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ ও সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা বহিরাগত শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবেই থেকে যাবে। বিপরীতে, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ পরিহার, বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্ভব।

সেই পথ সহজ নয়। বর্তমান শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিরোধের মুখে পড়বে। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো অঞ্চল দীর্ঘদিন অন্যের কৌশলগত স্বার্থের ওপর নির্ভর করে টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের গভীরে তাই শুধু যুদ্ধের প্রশ্ন নেই; রয়েছে রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। অঞ্চলটির জনগণ ও রাষ্ট্রগুলো কি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণ করবে, নাকি বহিরাগত শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে থাকবে—আগামী বছরগুলোতে সেই প্রশ্নের উত্তরই মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা গড়ে দেবে।