কোনও প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় না। এর পতন সাধারণত ধীর, দীর্ঘ এবং অনেকাংশে দৃশ্যমান। সংকেতগুলো সামনে থাকে, সতর্কবার্তাও শোনা যায়, কিন্তু সমস্যার মূল কারণ মোকাবিলার বদলে আমরা প্রায়শই বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলি। ফলে সংকট সাময়িকভাবে আড়াল হয়, কিন্তু সমাধান হয় না।
পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস এমনই এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বহু বছর ধরে সরকারি পরীক্ষাব্যবস্থার নানা দুর্বলতা—প্রশ্নফাঁস, মূল্যায়নের অসঙ্গতি, নম্বরের অস্বাভাবিক স্ফীতি এবং যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম সংস্কারের অভাব—মানুষের আস্থা ক্ষয় করেছে। কিন্তু এই সমস্যাগুলোর সমাধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার না এনে সমাজের একটি বড় অংশ অন্য পথ বেছে নিয়েছে। তারা সন্তানদের বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠিয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং তুলনামূলকভাবে বেশি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিশ্রুতি ছিল।
এভাবেই ধীরে ধীরে একটি সমান্তরাল শিক্ষাবাজার গড়ে ওঠে। স্কুল, কোচিং, শিক্ষক, পরীক্ষাকেন্দ্র, পাঠ্যসামগ্রী—সব মিলিয়ে এমন এক অবকাঠামো তৈরি হয়, যা কয়েক দশকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অনেকের কাছে এটি ছিল মানসম্মত শিক্ষার প্রতীক। কিন্তু কোনও ব্যবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। বিশেষত যখন সেটি দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং তার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে পড়ে।

বিশ্বাসযোগ্যতার মূল্য
যে মুহূর্তে একটি সনদ বা পরীক্ষাব্যবস্থা সমাজে মূল্যবান হয়ে ওঠে, সেই মুহূর্ত থেকেই সেটি অনৈতিক সুবিধা অর্জনের বাজারেও পরিণত হয়। উচ্চশিক্ষা, বৃত্তি কিংবা আন্তর্জাতিক সুযোগের প্রবেশদ্বার হিসেবে কোনও পরীক্ষার গুরুত্ব যত বাড়ে, সেটিকে ঘিরে শর্টকাটের চাহিদাও তত বাড়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং পরীক্ষার গোপনীয়তা ভঙ্গের ঘটনাগুলো উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। শুরুতে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে যা দেখা হয়েছিল, তা এখন অনেক বেশি সংগঠিত ও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন নেটওয়ার্ক এবং অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্য কেনাবেচার অভিযোগ দেখাচ্ছে যে সমস্যাটি আর ব্যতিক্রম নয়; এটি কাঠামোগত ঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, প্রতিটি ঘটনার পর কী পরিবর্তন হচ্ছে? দুর্বলতা কোথায় ছিল, তা কি শনাক্ত করা হয়েছে? দায়ীদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঠেকানোর জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? যদি এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না থাকে, তবে বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষয় অবশ্যম্ভাবী।
কারণ শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই বা পরীক্ষা নয়; এটি মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি সামাজিক চুক্তি। সেই আস্থা ভেঙে গেলে সনদের মূল্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সুবিধাভোগীরা কখনও আটকে থাকে না
তবে ইতিহাস আমাদের আরেকটি বাস্তবতা শেখায়। শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা দিলেও সমাজের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত অংশ সাধারণত বিকল্প পথ খুঁজে নেয়।

একসময় যারা স্থানীয় পরীক্ষাব্যবস্থা ছেড়ে আন্তর্জাতিক সনদের দিকে ঝুঁকেছিল, তারাই এখন আরও ব্যয়বহুল এবং আরও বিশেষায়িত শিক্ষাপথের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্যাকালরিয়েট বা বিদেশি স্কুলশিক্ষা ক্রমশ অভিজাত শ্রেণির কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমাহীন, তারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজনই অনুভব করে না।
অর্থাৎ কোনও ব্যবস্থার মান কমে গেলে সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না সমাজের শীর্ষস্তর। তারা অন্যত্র চলে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই বৃহৎ জনগোষ্ঠী, যাদের সামনে বিকল্পের সংখ্যা সীমিত।
এখানেই সমস্যার গভীরতা। কারণ একটি দেশের শিক্ষা কাঠামোকে কেবল ধনী পরিবারের পছন্দের ওপর নির্ভর করে বিচার করা যায় না। কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু কোটি কোটি শিক্ষার্থীর জন্য নয়।
আমদানি করা সমাধানের সীমাবদ্ধতা
অনেক সময় মনে হতে পারে, আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম বা বিদেশি সনদের বিস্তারই সমস্যার সমাধান। বাস্তবে এটি কেবল একটি সীমিত পরিসরের উত্তর। কারণ দেশের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী সেই সুযোগের বাইরে থেকে যায়।
যে দেশে কোটি কোটি স্কুলগামী শিশু রয়েছে, সেখানে একটি দুর্বল জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে পুরোপুরি আমদানিকৃত বিকল্প প্রতিষ্ঠা করা বাস্তবসম্মত নয়। কোনও বিদেশি পরীক্ষা, কোনও আন্তর্জাতিক বোর্ড কিংবা কোনও অভিজাত শিক্ষামডেল জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।

বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশ তখনই সফল হয়, যখন তার নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরীক্ষাব্যবস্থা এবং মূল্যায়ন কাঠামোর প্রতি নাগরিকদের আস্থা থাকে। সেই আস্থা তৈরি করতে সময় লাগে, কিন্তু হারাতে খুব বেশি সময় লাগে না।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই
শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই লক্ষণ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, রোগ নিয়ে নয়। প্রশ্নফাঁস, সনদের মান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জটিলতা—এসব আসলে বৃহত্তর সমস্যার উপসর্গ। মূল প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যার ওপর অধিকাংশ মানুষ আস্থা রাখতে পারে?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে সংস্কারের কঠিন পথ এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ প্রতিবার যখন আমরা মূল সমস্যার বদলে নতুন বিকল্প তৈরি করি, তখন সংকট শুধু অন্য জায়গায় সরে যায়।
সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি হয়তো আবারও নতুন পথ খুঁজে নেবে। ইতিহাস বলে, তারা প্রায়ই তা করে। কিন্তু একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় না তাদের পলায়নপথ দিয়ে; নির্ধারিত হয় সেই ব্যবস্থার মান দিয়ে, যার ওপর নির্ভর করে সাধারণ মানুষের সন্তানরা বড় হয়ে ওঠে।
সুতরাং প্রশ্নটি বিকল্প খোঁজার নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি এখনই প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজ শুরু করব, নাকি আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করে একই সমস্যার আরও বড় সংস্করণের মুখোমুখি হব?
আয়েশা রাজ্জাক 


















