আজকের কিশোরদের নিয়ে উদ্বেগের ধরন বদলে গেছে। একসময় অভিভাবক ও শিক্ষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পরীক্ষার ফল, পড়াশোনায় মনোযোগ, অনুপস্থিতি বা স্কুলের শৃঙ্খলা। এখন সেই পরিচিত উদ্বেগের জায়গা নিয়েছে সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতা। রাতভর অনলাইন গেমে ডুবে থাকা, সামাজিক মাধ্যমে অবিরাম উপস্থিতি, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, নতুন ধরনের আসক্তি, আচরণগত অস্থিরতা এবং মানসিক চাপ—এসব ক্রমশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনকে শুধুমাত্র “কিশোর বয়সের সমস্যা” হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আসলে আমরা এমন এক সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে বেড়ে ওঠার পরিবেশই আমূল বদলে গেছে। আজকের শিশু ও কিশোরদের জীবন আর শুধু পরিবার, স্কুল ও পাড়ার প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের চারপাশে রয়েছে স্মার্টফোন, সামাজিক মাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, বিনোদনের অসংখ্য ডিজিটাল উৎস এবং অনলাইন সামাজিক সম্পর্কের জটিল জগৎ। এই সবকিছু মিলেই তাদের চিন্তা, আচরণ ও পরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখছে।
ফলে বাস্তব ও ভার্চুয়াল জীবনের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। স্কুলের ঘণ্টা শেষ হলেও বন্ধুত্ব, প্রতিযোগিতা, স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা কিংবা সামাজিক চাপ শেষ হয় না। সেগুলো নতুন রূপে চলতে থাকে মোবাইলের পর্দায়। শ্রেণিকক্ষে যে আচরণ দেখা যায়, তার অনেকটাই আসলে সেই অদৃশ্য ডিজিটাল জগতের প্রতিফলন।

অতিরিক্ত গেম খেলা বা সামাজিক মাধ্যমে সময় কাটানোকে অনেকেই এখনও সাধারণ বিনোদন হিসেবে দেখেন। কিন্তু বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর। ঘুমের ঘাটতি, মনোযোগের দুর্বলতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা এবং পড়াশোনায় অনাগ্রহ—এসবের সঙ্গে ডিজিটাল অভ্যাসের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যম এমন এক তুলনার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে কিশোররা প্রতিনিয়ত নিজেদের অন্যদের সঙ্গে মাপছে। সাজানো-গোছানো জীবন, নিখুঁত সৌন্দর্য, দ্রুত সাফল্য কিংবা বিলাসী জীবনযাপনের ছবি তাদের সামনে এমন প্রত্যাশা তৈরি করছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে প্রায়ই মেলে না।
এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক মানসিক সংকট দৃশ্যমান রূপে প্রকাশ পায় না। একজন কিশোর সবসময় দুঃখী দেখাবে এমন নয়। কখনও সেই চাপ প্রকাশ পায় রাগ, অবাধ্যতা, আগ্রাসন, একাকিত্ব কিংবা পরিবারের সঙ্গে সংঘাতের মাধ্যমে। যাকে বড়রা “খারাপ আচরণ” বলে মনে করেন, সেটি অনেক সময় সাহায্যের জন্য নীরব সংকেতও হতে পারে।
এই বাস্তবতায় অভিভাবকদের ভূমিকা নতুনভাবে ভাবতে হবে। সন্তানের সঙ্গে একই ঘরে থাকা মানেই তার জগত সম্পর্কে জানা নয়। একজন কিশোর পরিবারকে ঘিরে বসে থাকলেও একই সময়ে সে বহু ডিজিটাল ও মানসিক পরিসরে বিচরণ করতে পারে। তাই অভিভাবকত্ব এখন আর শুধু নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারির বিষয় নয়; এটি সম্পর্ক, সংলাপ এবং আস্থার বিষয়। সন্তানের পছন্দ-অপছন্দ, উদ্বেগ, স্বপ্ন ও বন্ধুত্বের জগৎ সম্পর্কে জানার আগ্রহই তাকে সুরক্ষিত রাখার অন্যতম উপায়।
একইভাবে স্কুলগুলোকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলত জ্ঞান প্রদানের জন্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন তারা সামাজিক পরিবর্তনের প্রথম সাক্ষী। শিক্ষকেরা প্রায়ই শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তন সবার আগে লক্ষ্য করেন। তাই শুধু পাঠদান নয়, মানসিক সুস্থতা, ডিজিটাল সচেতনতা, সম্পর্কবিষয়ক শিক্ষা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দক্ষতাও শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হওয়া প্রয়োজন।

অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে নিয়মিত তথ্য ও পর্যবেক্ষণ বিনিময়ও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে যা ধরা পড়ে, স্কুলে তা নাও দেখা যেতে পারে; আবার স্কুলে যে পরিবর্তন স্পষ্ট হয়, পরিবার তা বুঝতে দেরি করতে পারে। দুই পক্ষের পর্যবেক্ষণ একত্রিত হলে কিশোরদের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অনেক স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিভাবকদের নিজেদের মধ্যেও যোগাযোগ বাড়ানো। অনেক পরিবার মনে করে তাদের সমস্যাগুলো একান্ত ব্যক্তিগত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, স্ক্রিন-আসক্তি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা আচরণগত সংকটের মতো সমস্যাগুলো অসংখ্য পরিবারের অভিন্ন অভিজ্ঞতা। পারস্পরিক আলোচনা এই সমস্যাগুলোর প্রতি কলঙ্কবোধ কমাতে এবং কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজতে সাহায্য করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, আজকের কিশোররা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক দ্রুত, অনেক বেশি এবং অনেক জটিল সামাজিক প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে। তাই তাদের সহায়তায় প্রতিক্রিয়াও হতে হবে সমন্বিত। পরিবার, স্কুল, চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী, সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠন এবং নীতিনির্ধারকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
একসময় বলা হতো, একটি শিশুকে বড় করে তুলতে পুরো গ্রামের প্রয়োজন হয়। ডিজিটাল যুগে সেই কথার অর্থ আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন একটি শিশুর বেড়ে ওঠা নির্ভর করে একটি সম্পূর্ণ সামাজিক ও প্রযুক্তিগত পরিবেশের ওপর। আর যদি সেই পরিবেশই তাদের গঠন করে, তবে তাদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতেও আমাদের একই রকম সমন্বিত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
চন্দ্রকান্ত লাহারিয় 


















