০৩:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
৭০ বছরে কিম ক্যাট্রাল: লাল গালিচায় তাঁর ৭০টি স্মরণীয় সাজ গরমের দিনে ক্যাট চেনের ঘরোয়া আড্ডা, যেখানে খাবার-পানীয়ের সঙ্গে মিশে যায় স্বস্তি জিএলপি-১ ওষুধের যুগে বদলে যাচ্ছে সৌন্দর্যের ধারণা শেরপুরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ, ২৫ ঘণ্টা পর বিল থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার দ্বিতীয় টেস্টের আগে স্বস্তি, নেটে ফিরেছেন তানজিদ-মুশফিক পুরুষের সাজে নতুন ঝলক, কানে দুলের দাপট চীনে মার্কিন শিক্ষাবিদের আটক নিয়ে রুবিওর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান বেইজিংয়ের দিনাজপুরে ট্রাকের ধাক্কায় মা-মেয়ের মৃত্যু, বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়া হলো না হামসদৃশ উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, দেশে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যু ৯২৮ তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় ঢাকা

শিক্ষাব্যবস্থার সংকট: নম্বরের খাতা নয়, বদলাতে হবে শেখার ভিত্তি

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তার উত্তর খুঁজতে গেলে পরীক্ষার ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন একই ধরনের দুর্বল ফলাফল বছরের পর বছর ধরে ফিরে আসে, তখন সমস্যাটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক শিক্ষাগত সক্ষমতা মূল্যায়নের ফল সেই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল দেখিয়েছে, গণিত ও ভাষাগত দক্ষতায় তারা প্রত্যাশিত মান থেকে অনেক পিছিয়ে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো নতুন প্রবণতা নয়। গত দুই দশকে বিভিন্ন ধরনের জাতীয় মূল্যায়ন ও পরীক্ষার ফলেও একই চিত্র দেখা গেছে। ফলে পরিষ্কার যে সমস্যার উৎস কোথাও আরও গভীরে।

অনেক সময় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হলে পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তি কিংবা পরীক্ষা পদ্ধতির কথা সামনে আসে। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হলো শিক্ষক। একজন শিক্ষার্থীর শেখার আগ্রহ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতা গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। সেই অভিজ্ঞতার মান নির্ভর করে শিক্ষক কতটা প্রস্তুত, কতটা দক্ষ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর।

যদি শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে অন্য বিষয় বেশি গুরুত্ব পায়, যদি বিদ্যালয় পরিচালনায় পেশাদারিত্বের ঘাটতি থাকে, তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উন্নত ফলাফল প্রত্যাশা করা কঠিন। শিক্ষার মান শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের মানের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করার শামিল।

তবে আরেকটি বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার মান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা প্রয়োজন হলেও, শিক্ষা যদি ক্রমশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তাহলে শেখার প্রকৃত উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যালয়গুলো তখন জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে নম্বর অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করে। এর ফলে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ কিংবা চরিত্র গঠনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব হারায়।

Bangladesh Education System Reform | After decades of failure, can we  finally fix our education system? | The Daily Star

একজন শিক্ষার্থীর ছয় বা বারো বছরের শিক্ষাজীবনকে কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষার মাধ্যমে পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। নম্বর গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই শিক্ষার একমাত্র সূচক নয়। একজন শিক্ষার্থী কীভাবে চিন্তা করে, সমস্যার সমাধান করে, অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে বা সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে—এসবও শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবু মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে পরীক্ষার ফল নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করতে পারে। কোন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে, কোন বিষয়ে দুর্বলতা বেশি কিংবা কোথায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন—এসব বোঝার ক্ষেত্রে মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সেই তথ্যকে যদি শিক্ষার উন্নয়নের হাতিয়ার না বানিয়ে প্রতিযোগিতা ও চাপ তৈরির উপকরণে পরিণত করা হয়, তাহলে এর সুফল সীমিত হয়ে যায়।

এখানে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার কী? শিক্ষার জন্য বরাদ্দ সম্পদ যদি এমন কর্মসূচিতে ব্যয় হয়, যা সরাসরি শেখার মান উন্নত করে না, তাহলে শ্রেণিকক্ষের মৌলিক সংকট অমীমাংসিত থেকে যাবে। উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং কার্যকর স্কুল পরিচালনার বিকল্প নেই।

বর্তমান ফলাফল তাই শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি একটি ব্যবস্থাগত সতর্কসংকেত। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে শেখার প্রক্রিয়ায় কোথাও গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়ে গেছে। সমস্যার সমাধান আরও পরীক্ষা নেওয়ার মধ্যে নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরির মধ্যে যেখানে শেখা হবে মূল লক্ষ্য এবং পরীক্ষা হবে সেই শেখার অগ্রগতি বোঝার একটি মাধ্যম।

একটি দেশের ভবিষ্যৎ তার শ্রেণিকক্ষেই গড়ে ওঠে। সেখানে যদি যুক্তিবোধ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং স্বাধীন চিন্তার বিকাশ না ঘটে, তবে তার প্রভাব শিক্ষা খাতের বাইরেও বিস্তৃত হবে। অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই ঘাটতির প্রতিফলন দেখা দেবে। তাই শিক্ষার মান নিয়ে বর্তমান উদ্বেগকে সাময়িক আলোচনা হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

৭০ বছরে কিম ক্যাট্রাল: লাল গালিচায় তাঁর ৭০টি স্মরণীয় সাজ

শিক্ষাব্যবস্থার সংকট: নম্বরের খাতা নয়, বদলাতে হবে শেখার ভিত্তি

০৫:৩৪:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তার উত্তর খুঁজতে গেলে পরীক্ষার ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন একই ধরনের দুর্বল ফলাফল বছরের পর বছর ধরে ফিরে আসে, তখন সমস্যাটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক শিক্ষাগত সক্ষমতা মূল্যায়নের ফল সেই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল দেখিয়েছে, গণিত ও ভাষাগত দক্ষতায় তারা প্রত্যাশিত মান থেকে অনেক পিছিয়ে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো নতুন প্রবণতা নয়। গত দুই দশকে বিভিন্ন ধরনের জাতীয় মূল্যায়ন ও পরীক্ষার ফলেও একই চিত্র দেখা গেছে। ফলে পরিষ্কার যে সমস্যার উৎস কোথাও আরও গভীরে।

অনেক সময় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হলে পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তি কিংবা পরীক্ষা পদ্ধতির কথা সামনে আসে। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হলো শিক্ষক। একজন শিক্ষার্থীর শেখার আগ্রহ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতা গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। সেই অভিজ্ঞতার মান নির্ভর করে শিক্ষক কতটা প্রস্তুত, কতটা দক্ষ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর।

যদি শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে অন্য বিষয় বেশি গুরুত্ব পায়, যদি বিদ্যালয় পরিচালনায় পেশাদারিত্বের ঘাটতি থাকে, তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উন্নত ফলাফল প্রত্যাশা করা কঠিন। শিক্ষার মান শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের মানের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করার শামিল।

তবে আরেকটি বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার মান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা প্রয়োজন হলেও, শিক্ষা যদি ক্রমশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তাহলে শেখার প্রকৃত উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যালয়গুলো তখন জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে নম্বর অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করে। এর ফলে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ কিংবা চরিত্র গঠনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব হারায়।

Bangladesh Education System Reform | After decades of failure, can we  finally fix our education system? | The Daily Star

একজন শিক্ষার্থীর ছয় বা বারো বছরের শিক্ষাজীবনকে কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষার মাধ্যমে পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। নম্বর গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই শিক্ষার একমাত্র সূচক নয়। একজন শিক্ষার্থী কীভাবে চিন্তা করে, সমস্যার সমাধান করে, অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে বা সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে—এসবও শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবু মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে পরীক্ষার ফল নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করতে পারে। কোন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে, কোন বিষয়ে দুর্বলতা বেশি কিংবা কোথায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন—এসব বোঝার ক্ষেত্রে মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সেই তথ্যকে যদি শিক্ষার উন্নয়নের হাতিয়ার না বানিয়ে প্রতিযোগিতা ও চাপ তৈরির উপকরণে পরিণত করা হয়, তাহলে এর সুফল সীমিত হয়ে যায়।

এখানে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার কী? শিক্ষার জন্য বরাদ্দ সম্পদ যদি এমন কর্মসূচিতে ব্যয় হয়, যা সরাসরি শেখার মান উন্নত করে না, তাহলে শ্রেণিকক্ষের মৌলিক সংকট অমীমাংসিত থেকে যাবে। উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং কার্যকর স্কুল পরিচালনার বিকল্প নেই।

বর্তমান ফলাফল তাই শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি একটি ব্যবস্থাগত সতর্কসংকেত। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে শেখার প্রক্রিয়ায় কোথাও গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়ে গেছে। সমস্যার সমাধান আরও পরীক্ষা নেওয়ার মধ্যে নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরির মধ্যে যেখানে শেখা হবে মূল লক্ষ্য এবং পরীক্ষা হবে সেই শেখার অগ্রগতি বোঝার একটি মাধ্যম।

একটি দেশের ভবিষ্যৎ তার শ্রেণিকক্ষেই গড়ে ওঠে। সেখানে যদি যুক্তিবোধ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং স্বাধীন চিন্তার বিকাশ না ঘটে, তবে তার প্রভাব শিক্ষা খাতের বাইরেও বিস্তৃত হবে। অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই ঘাটতির প্রতিফলন দেখা দেবে। তাই শিক্ষার মান নিয়ে বর্তমান উদ্বেগকে সাময়িক আলোচনা হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।