মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘরে বসে অ্যালকোহল তৈরি নিষিদ্ধ—এ তথ্য অনেকের কাছেই অজানা। কিন্তু এই আপাতদৃষ্টিতে ছোট একটি আইনি প্রশ্ন এখন এমন এক সাংবিধানিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে, যার প্রভাব কেবল মদ প্রস্তুতকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিষয়টি আসলে রাষ্ট্রক্ষমতার সীমা কোথায় শেষ হবে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিসর কোথায় শুরু হবে, সেই মৌলিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য স্পিরিট বা পাতিত মদ তৈরিকে নিষিদ্ধ রেখেছে। এই নিষেধাজ্ঞার শিকড় উনিশ শতকের করব্যবস্থার মধ্যে নিহিত। সে সময় সরকার অ্যালকোহল ও তামাক থেকে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, একটি কার্যক্রমে কর আরোপের ক্ষমতা কি সেই কার্যক্রমকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও দেয়?
সম্প্রতি দুটি ভিন্ন ফেডারেল আদালতের বিপরীতমুখী রায় এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। এক আদালত নিষেধাজ্ঞাকে বৈধ বলেছে, অন্যটি তা অসাংবিধানিক বলে আখ্যা দিয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কর আদায়ের ক্ষমতা কি নিষেধাজ্ঞার লাইসেন্স?
ফেডারেল সরকারের প্রধান যুক্তি হলো, ঘরে বসে মদ তৈরি নিষিদ্ধ করা কর আদায় কার্যকর রাখার জন্য “প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত” ব্যবস্থা। তাদের মতে, অতীতে ব্যাপক কর ফাঁকির কারণে উৎপাদনের স্থান সীমিত করা জরুরি ছিল।
কিন্তু এই যুক্তির মধ্যেই একটি মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। যদি কোনো কার্যক্রম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে সেই কার্যক্রম থেকে কর আদায়ের প্রশ্নই আসে না। অর্থাৎ কর সংগ্রহের স্বার্থে যে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হচ্ছে, সেটিই আবার কর আরোপের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলে এটি এক ধরনের সাংঘর্ষিক অবস্থান।
আরও বড় প্রশ্ন হলো, যদি করব্যবস্থা কার্যকর রাখার অজুহাতে কংগ্রেস কোনো কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পারে, তাহলে সেই ক্ষমতার সীমা কোথায়? আজ ঘরে মদ তৈরি, কাল কি ঘরে ব্যবসা পরিচালনা, অনলাইন কাজ কিংবা ব্যক্তিগত উৎপাদনের অন্য কোনো ক্ষেত্রও একই যুক্তিতে নিষিদ্ধ হতে পারে?
এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যাখ্যা একবার বিস্তৃত হয়ে গেলে তা প্রায়ই নতুন নতুন ক্ষেত্রে প্রয়োগের পথ খুলে দেয়।

বাণিজ্য ধারা ও তার বিস্তৃত ব্যাখ্যা
সরকারের দ্বিতীয় যুক্তি এসেছে সংবিধানের বাণিজ্য ধারার ওপর ভিত্তি করে। ঐতিহাসিকভাবে এই ধারা আন্তঃরাজ্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আদালত এর ব্যাখ্যা অনেক বিস্তৃত করেছে।
এর ফলে এমন অনেক কর্মকাণ্ডও ফেডারেল নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসেছে, যেগুলো সরাসরি বাজারে অংশ না নিলেও সম্ভাব্যভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই যুক্তির ভিত্তিতেই অতীতে ঘরে উৎপাদিত কিছু পণ্য কিংবা ব্যক্তিগত জমিতে চাষ করা ফসল সম্পর্কেও ফেডারেল ক্ষমতা স্বীকৃতি পেয়েছে।
তবে এখানেও একই প্রশ্ন ফিরে আসে—সীমারেখা কোথায়?
মদ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে অধিকাংশ ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারের হাতে রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা যুগের অবসানের পর ফেডারেল সরকারের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়েছে। সেই বাস্তবতায় ঘরে বসে অল্প পরিমাণে মদ উৎপাদনের মতো কর্মকাণ্ডকে ফেডারেল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা
এই মামলার তাৎপর্য মূলত মদ তৈরির প্রশ্নে নয়। এটি পরীক্ষা করবে, ফেডারেল সরকার কতদূর পর্যন্ত ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করতে পারে। একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার বৈধতা শুধু উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে না; তার স্পষ্ট সীমাও থাকতে হয়।
যদি “প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত” কিংবা “বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ” ধরনের বিস্তৃত ধারণাগুলো সীমাহীনভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বহু ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডকেই একই যুক্তিতে নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর সেখানেই ব্যক্তিস্বাধীনতা ও রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
সুপ্রিম কোর্ট যদি এই মামলাটি গ্রহণ করে, তাহলে তাদের সিদ্ধান্ত কেবল ঘরে তৈরি মদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। বরং এটি নির্ধারণ করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল সরকারের সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমানা কোথায় টানা হবে এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসর কতটা সুরক্ষিত থাকবে।
এই কারণেই বিতর্কটি মদের বোতলের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নিয়ে একটি বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রশ্ন।
জ্যারেট ডিটারলে 



















