০৭:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
নিউইয়র্ক মেয়র মামদানি বললেন, নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা নেই নগর প্রশাসনের ১৮ বছরেই থেমে গেল হলিউডের উদীয়মান তারকা কেলি হটলের জীবন, সড়ক দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া কিয়োডো নিউজকে শেখ হাসিনা: ‘ফিরব, আদালতে দাঁড়াব’—মৃত্যুদণ্ডের রায়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দাবি এনসিটি উইশ ও রিসিনকে নিয়ে জমজমাট গ্রীষ্মকালীন জলসঙ্গীত উৎসব মেসিকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি: যখন সুন্দর খেলা ঘৃণার অস্ত্রে পরিণত হয় লোহিত সাগরে হুমকিতে উত্তেজনা, সৌদি আরবের পাশে থাকার ঘোষণা পাকিস্তানের আশার রাজনীতি নয়, বাস্তবতার শাসনই ব্রিটেনের প্রকৃত পরীক্ষা বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত ১০, আটক দুই নারী আত্মঘাতী হামলাকারী সমুদ্রের তলায় ৮০ কিলোমিটারের পর্দা! অ্যান্টার্কটিকার ‘ভয়ংকর’ হিমবাহ বাঁচাতে নতুন পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর অভিযোগ, দিল্লির বিক্ষোভ ঘিরে বিরোধীদের কড়া নিশানা রাজনাথ সিংয়ের

ইতিহাসের ছায়া, ভবিষ্যতের ঝুঁকি: মহাশক্তির প্রতিযোগিতা কি আবার বিশ্বকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

বিশ্ব রাজনীতিতে ইতিহাসের ব্যবহার কখনও আলোকবর্তিকা, কখনও ফাঁদ। রাষ্ট্রনায়করা যখন অতীতের ঘটনাকে বর্তমান সংকটের ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন সেই তুলনা তাদের দূরদর্শীও করতে পারে, আবার বিপজ্জনক বিভ্রান্তির দিকেও ঠেলে দিতে পারে। সমস্যা হলো, ইতিহাস কখনও নিজেকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে না। কিন্তু মানুষ প্রায়ই অতীতের পরিচিত ছবির মধ্যে বর্তমানকে দেখতে চায়। আর এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্তের জন্ম দিতে পারে।

আজকের বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত এবং আরও কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তির উত্থান এমন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে একক আধিপত্যের যুগ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে অনেকে স্বাভাবিক শক্তির পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখেন। কিন্তু অন্যরা এতে খুঁজে পান বিংশ শতাব্দীর শুরুর ইউরোপের প্রতিচ্ছবি—এক এমন সময়, যখন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ এবং সামরিক প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষগুলোর একটিকে ডেকে এনেছিল।

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশের একটি উদ্বেগজনক বৈশিষ্ট্য হলো পারস্পরিক সন্দেহের বিস্তার। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর জনগণ ক্রমশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র তাদের ক্ষতি করতে চায়। এই মানসিকতা শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ককে কঠিন করে না; এটি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপকে শত্রুতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। ফলাফল হিসেবে সংলাপের জায়গা সংকুচিত হয় এবং প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপও আক্রমণাত্মক বলে মনে হতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে যুদ্ধ সম্পর্কে সমসাময়িক মানুষের ধারণা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জন্ম নেওয়া অধিকাংশ মানুষ কখনও প্রকৃত মহাশক্তির যুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। তারা সীমিত যুদ্ধ, প্রক্সি সংঘাত বা আঞ্চলিক সংঘর্ষ দেখেছে, কিন্তু এমন যুদ্ধ নয় যা পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, নির্ভুল অস্ত্র এবং দূরনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের ধারণা অনেকের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি করেছে যে আধুনিক যুদ্ধ নিয়ন্ত্রিত, সীমিত এবং ব্যবস্থাপনাযোগ্য হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যুদ্ধ শুরু করার পরিকল্পনা যতই নিখুঁত হোক, তার পরিণতি খুব কম ক্ষেত্রেই পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের নেতারাও নিজেদের যুক্তিসঙ্গত মনে করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন সামরিক প্রস্তুতি যুদ্ধ ঠেকাবে, দ্রুত আঘাত বিজয় নিশ্চিত করবে এবং জোটব্যবস্থা স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটা। যুদ্ধের ভয়ই রাষ্ট্রগুলোকে এমনভাবে সশস্ত্র করেছিল যে সংকট দেখা দেওয়ার পর পিছু হটার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সামরিক পরিকল্পনা এবং কূটনৈতিক লক্ষ্য একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা সংকুচিত হয়, ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত একটি আঞ্চলিক সংকট বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।

আজকের বিশ্বে সেই বিপদের নতুন সংস্করণ দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটন এবং বেইজিং একে অপরের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। বাণিজ্যনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক উপস্থিতি, জোট গঠন কিংবা আঞ্চলিক সম্পর্ক—সবকিছুই প্রতিযোগিতার বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে পড়ছে। এর ফলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে অবিশ্বাস নিজেই নতুন অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো প্রযুক্তির প্রভাব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা, সাইবার সক্ষমতা এবং রিয়েল-টাইম তথ্যপ্রবাহ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে দ্রুততর করছে। কিন্তু দ্রুততা সবসময় প্রজ্ঞার সমার্থক নয়। বরং রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের ওপর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভুল হিসাব, অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া বা ভুল সংকেতের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

তবে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এই নয় যে যুদ্ধ অনিবার্য। বরং শিক্ষা হলো, যুদ্ধ অনিবার্য মনে হতে শুরু করলে সেটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত। ১৯১৪ সালে যুদ্ধ অবধারিত ছিল না। তবুও নানা ভুল সিদ্ধান্ত, অহংকার, ভুল বোঝাবুঝি এবং কৌশলগত আতঙ্কের সমষ্টি বিশ্বকে সেই পথে ঠেলে দেয়। বর্তমান সময়েও একই সত্য প্রযোজ্য। মহাশক্তির প্রতিযোগিতা নিজে যুদ্ধের কারণ নয়; বিপদ তৈরি হয় তখন, যখন প্রতিযোগিতাকে শূন্য-সম সমীকরণ হিসেবে দেখা হয় এবং প্রতিটি সংকটকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

শান্তি টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু সামরিক ভারসাম্য যথেষ্ট নয়। কার্যকর কূটনীতি, বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং সংকট ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা সমানভাবে জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোকে মেনে নিতে হবে যে পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। নতুন শক্তির উত্থান, অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস কিংবা ভূরাজনৈতিক রূপান্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা। এগুলোকে প্রতিহত করার চেষ্টা প্রায়ই আরও বড় সংঘাতের জন্ম দেয়।

সবচেয়ে বড় ভুল হবে এই বিশ্বাস করা যে আধুনিক প্রযুক্তি যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তুলেছে। ইতিহাসের প্রতিটি বড় সংঘর্ষের শুরুতে মানুষ ভেবেছিল পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুদ্ধই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাই আজকের বিশ্বের সামনে মূল প্রশ্ন হলো না কে বেশি শক্তিশালী, বরং কে ইতিহাসের সতর্কবার্তাগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে শুনতে প্রস্তুত। কারণ অতীতের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলো প্রায়ই শুরু হয়েছিল এই ধারণা থেকে যে সেগুলো ঘটবে না। আর যখন সবাই যুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী ধরে নিতে শুরু করে, তখনই শান্তির পক্ষে সবচেয়ে দৃঢ় কণ্ঠস্বরের প্রয়োজন হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

নিউইয়র্ক মেয়র মামদানি বললেন, নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা নেই নগর প্রশাসনের

ইতিহাসের ছায়া, ভবিষ্যতের ঝুঁকি: মহাশক্তির প্রতিযোগিতা কি আবার বিশ্বকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

০১:০৩:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতিতে ইতিহাসের ব্যবহার কখনও আলোকবর্তিকা, কখনও ফাঁদ। রাষ্ট্রনায়করা যখন অতীতের ঘটনাকে বর্তমান সংকটের ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন সেই তুলনা তাদের দূরদর্শীও করতে পারে, আবার বিপজ্জনক বিভ্রান্তির দিকেও ঠেলে দিতে পারে। সমস্যা হলো, ইতিহাস কখনও নিজেকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে না। কিন্তু মানুষ প্রায়ই অতীতের পরিচিত ছবির মধ্যে বর্তমানকে দেখতে চায়। আর এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্তের জন্ম দিতে পারে।

আজকের বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত এবং আরও কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তির উত্থান এমন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে একক আধিপত্যের যুগ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে অনেকে স্বাভাবিক শক্তির পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখেন। কিন্তু অন্যরা এতে খুঁজে পান বিংশ শতাব্দীর শুরুর ইউরোপের প্রতিচ্ছবি—এক এমন সময়, যখন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ এবং সামরিক প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষগুলোর একটিকে ডেকে এনেছিল।

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশের একটি উদ্বেগজনক বৈশিষ্ট্য হলো পারস্পরিক সন্দেহের বিস্তার। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর জনগণ ক্রমশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র তাদের ক্ষতি করতে চায়। এই মানসিকতা শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ককে কঠিন করে না; এটি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপকে শত্রুতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। ফলাফল হিসেবে সংলাপের জায়গা সংকুচিত হয় এবং প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপও আক্রমণাত্মক বলে মনে হতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে যুদ্ধ সম্পর্কে সমসাময়িক মানুষের ধারণা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জন্ম নেওয়া অধিকাংশ মানুষ কখনও প্রকৃত মহাশক্তির যুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। তারা সীমিত যুদ্ধ, প্রক্সি সংঘাত বা আঞ্চলিক সংঘর্ষ দেখেছে, কিন্তু এমন যুদ্ধ নয় যা পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, নির্ভুল অস্ত্র এবং দূরনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের ধারণা অনেকের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি করেছে যে আধুনিক যুদ্ধ নিয়ন্ত্রিত, সীমিত এবং ব্যবস্থাপনাযোগ্য হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যুদ্ধ শুরু করার পরিকল্পনা যতই নিখুঁত হোক, তার পরিণতি খুব কম ক্ষেত্রেই পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের নেতারাও নিজেদের যুক্তিসঙ্গত মনে করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন সামরিক প্রস্তুতি যুদ্ধ ঠেকাবে, দ্রুত আঘাত বিজয় নিশ্চিত করবে এবং জোটব্যবস্থা স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটা। যুদ্ধের ভয়ই রাষ্ট্রগুলোকে এমনভাবে সশস্ত্র করেছিল যে সংকট দেখা দেওয়ার পর পিছু হটার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সামরিক পরিকল্পনা এবং কূটনৈতিক লক্ষ্য একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা সংকুচিত হয়, ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত একটি আঞ্চলিক সংকট বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।

আজকের বিশ্বে সেই বিপদের নতুন সংস্করণ দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটন এবং বেইজিং একে অপরের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। বাণিজ্যনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক উপস্থিতি, জোট গঠন কিংবা আঞ্চলিক সম্পর্ক—সবকিছুই প্রতিযোগিতার বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে পড়ছে। এর ফলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে অবিশ্বাস নিজেই নতুন অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো প্রযুক্তির প্রভাব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা, সাইবার সক্ষমতা এবং রিয়েল-টাইম তথ্যপ্রবাহ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে দ্রুততর করছে। কিন্তু দ্রুততা সবসময় প্রজ্ঞার সমার্থক নয়। বরং রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের ওপর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভুল হিসাব, অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া বা ভুল সংকেতের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

তবে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এই নয় যে যুদ্ধ অনিবার্য। বরং শিক্ষা হলো, যুদ্ধ অনিবার্য মনে হতে শুরু করলে সেটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত। ১৯১৪ সালে যুদ্ধ অবধারিত ছিল না। তবুও নানা ভুল সিদ্ধান্ত, অহংকার, ভুল বোঝাবুঝি এবং কৌশলগত আতঙ্কের সমষ্টি বিশ্বকে সেই পথে ঠেলে দেয়। বর্তমান সময়েও একই সত্য প্রযোজ্য। মহাশক্তির প্রতিযোগিতা নিজে যুদ্ধের কারণ নয়; বিপদ তৈরি হয় তখন, যখন প্রতিযোগিতাকে শূন্য-সম সমীকরণ হিসেবে দেখা হয় এবং প্রতিটি সংকটকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

শান্তি টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু সামরিক ভারসাম্য যথেষ্ট নয়। কার্যকর কূটনীতি, বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং সংকট ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা সমানভাবে জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোকে মেনে নিতে হবে যে পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। নতুন শক্তির উত্থান, অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস কিংবা ভূরাজনৈতিক রূপান্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা। এগুলোকে প্রতিহত করার চেষ্টা প্রায়ই আরও বড় সংঘাতের জন্ম দেয়।

সবচেয়ে বড় ভুল হবে এই বিশ্বাস করা যে আধুনিক প্রযুক্তি যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তুলেছে। ইতিহাসের প্রতিটি বড় সংঘর্ষের শুরুতে মানুষ ভেবেছিল পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুদ্ধই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাই আজকের বিশ্বের সামনে মূল প্রশ্ন হলো না কে বেশি শক্তিশালী, বরং কে ইতিহাসের সতর্কবার্তাগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে শুনতে প্রস্তুত। কারণ অতীতের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলো প্রায়ই শুরু হয়েছিল এই ধারণা থেকে যে সেগুলো ঘটবে না। আর যখন সবাই যুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী ধরে নিতে শুরু করে, তখনই শান্তির পক্ষে সবচেয়ে দৃঢ় কণ্ঠস্বরের প্রয়োজন হয়।