পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বিশাল থোয়েটস হিমবাহ দ্রুত গলছে। সমুদ্রের তুলনামূলক উষ্ণ পানি নিচের দিক থেকে বরফ ক্ষয় করে এই হিমবাহকে দুর্বল করে তুলছে। এই পরিস্থিতি ঠেকাতে বিজ্ঞানীরা এবার এক অভিনব পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। সমুদ্রের তলদেশে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বিশেষ পর্দা বসিয়ে উষ্ণ সাগরস্রোতের পথ বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
কেন দরকার সমুদ্রের তলায় পর্দা?
বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য সমুদ্রের প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা নয়। বরং যে উষ্ণ গভীর স্রোত হিমবাহের নিচে পৌঁছে বরফ গলিয়ে দিচ্ছে, সেটিকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়াই এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করা হবে নমনীয় একটি বিশাল কাঠামো। এটি উষ্ণ পানির প্রবাহকে উপরে তুলে বা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেবে, যাতে সেই পানি সরাসরি হিমবাহের নিচে পৌঁছাতে না পারে। একই সঙ্গে ঠান্ডা পানি ও সামুদ্রিক প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল অব্যাহত থাকবে।
বিশাল আকারের প্রকল্প
প্রস্তাবিত এই পর্দার দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৮০ কিলোমিটার এবং উচ্চতা সর্বোচ্চ ১৫০ মিটার। এটি প্রায় ৬৫০ মিটার গভীর সমুদ্রে স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এত বড় কাঠামোকে সমুদ্রের স্থায়ী স্রোত, বরফের চাপ এবং কঠিন পরিবেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল রাখা বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এখনো গবেষণার পর্যায়ে
এই কাঠামো এখনো নির্মাণ করা হয়নি। এটি প্রাথমিক গবেষণা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। গবেষকরা উপযুক্ত নির্মাণসামগ্রী, নোঙর ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত অ্যান্টার্কটিকার আমুন্ডসেন সাগরে একটি বৈজ্ঞানিক অভিযান পরিচালিত হয়। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ যন্ত্র স্থাপন করে সমুদ্রের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, স্রোতের গতি এবং পানির অস্থিরতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এসব তথ্যের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে, উষ্ণ স্রোত ঠিক কোন পথে, কত গভীরতায় এবং কত শক্তিতে হিমবাহের দিকে এগিয়ে যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হবে কোথায় এমন একটি পর্দা কার্যকর হতে পারে।

প্রকৃতিই দিচ্ছে পরীক্ষার সুযোগ
গবেষণার একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে নরওয়ের স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে। সেখানে দুটি ফিয়র্ডের তুলনা করে বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করছেন, প্রাকৃতিক পানির নিচের বাধা কীভাবে উষ্ণ পানি প্রবেশ সীমিত করে।
একটি ফিয়র্ডে স্বাভাবিকভাবেই পানির নিচে একটি উঁচু অংশ রয়েছে, যা উষ্ণ স্রোতের প্রবেশ কমিয়ে দেয়। অন্যটিতে এমন বাধা না থাকায় সেখানে তুলনামূলক উষ্ণ পানি প্রবেশ করে। এই প্রাকৃতিক পার্থক্য থেকেই ভবিষ্যতের কৃত্রিম পর্দার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার আশা করছেন গবেষকরা।
সেপ্টেম্বরে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন
স্বালবার্ডের এই গবেষণার ফলাফল ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশের কথা রয়েছে। সেই প্রতিবেদনে জানা যেতে পারে, এমন একটি পানির নিচের পর্দা বাস্তবে কতটা কার্যকর হতে পারে এবং এর পরিবেশগত প্রভাব কী হতে পারে।
একই সঙ্গে তিন বছরের একটি গবেষণা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রকল্পের নকশা, নির্মাণপ্রযুক্তি, উপকরণ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়েও কাজ চলছে।
ব্যয় বিপুল, কিন্তু লাভ আরও বড়?
গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হতে পারে প্রায় ৪০ থেকে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তবে পরিকল্পনার সমর্থকদের দাবি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি থেকে ভবিষ্যতে যে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে, তার তুলনায় এই ব্যয় অনেক কম।
থোয়েটস হিমবাহকে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি পৃথিবীর বার্ষিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে এবং অ্যান্টার্কটিকার অভ্যন্তরের বিপুল বরফকে আটকে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এই হিমবাহের ভবিষ্যৎ শুধু অ্যান্টার্কটিকার নয়, উপকূলীয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সমুদ্রের তলায় ৮০ কিলোমিটারের বিশেষ পর্দা বসিয়ে অ্যান্টার্কটিকার থোয়েটস হিমবাহকে উষ্ণ সাগরস্রোতের ক্ষয় থেকে রক্ষার সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















