হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী গিনা ডেভিস ৭০ বছরে পা দিয়েও যেন আগের মতোই প্রাণবন্ত। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি যেমন পর্দায় শক্তিশালী নারী চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করেছেন, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও সেই চরিত্রগুলোর প্রভাব তাঁর আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের জীবন, ক্যারিয়ার, সংগ্রাম এবং নতুন কাজ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।
নতুন সিরিজে নতুন চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে ডেভিস অভিনয় করছেন নেটফ্লিক্সের নতুন সিরিজ ‘দ্য বরোজ’-এ। বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, রহস্য এবং ভৌতিক উপাদানের মিশেলে নির্মিত এই সিরিজে তিনি এমন এক প্রবীণ নারীর চরিত্রে অভিনয় করছেন, যিনি অন্যদের সঙ্গে মিলে অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেন। সিরিজটিতে তাঁর সহশিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন আলফ্রেড মোলিনা ও ক্লার্ক পিটার্স। ডেভিসের ভাষায়, শুটিংয়ের পুরো অভিজ্ঞতাই ছিল আনন্দময় এবং সৃজনশীল।

বয়স নয়, মানসিকতাই আসল
৭০ বছরে পৌঁছানো নিয়ে তাঁর কোনো উদ্বেগ নেই। ডেভিস মনে করেন, মানুষ বয়সে বড় হলেও ভেতরের মানুষটি একই থাকে। তাঁর নিজের অনুভূতিতে তিনি এখনও ৩৫ বছরের একজন নারী। এই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে নতুন কাজ এবং নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে।
‘থেলমা অ্যান্ড লুইস’ বদলে দিয়েছিল সবকিছু
১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘থেলমা অ্যান্ড লুইস’ ডেভিসের ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। ছবিটি শুধু দর্শকদের নয়, তাঁকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সহশিল্পী সুসান সার্যান্ডনের আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব তাঁকে উপলব্ধি করিয়েছিল যে নিজের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা দুর্বলতা নয়, বরং শক্তির পরিচয়। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে।
তিনি জানান, ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত ভদ্র এবং আত্মসংকোচী হয়ে বড় হয়েছিলেন। অন্যকে বিরক্ত না করার প্রবণতা এতটাই ছিল যে নিজের ইচ্ছার কথাও অনেক সময় বলতেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝেছেন, অতিরিক্ত আত্মত্যাগ বা নীরবতা মানুষকে আরও প্রিয় করে তোলে না।
হলিউডে নারীদের জন্য অসম বাস্তবতা

‘থেলমা অ্যান্ড লুইস’ এবং ‘এ লিগ অব দেয়ার ওন’-এর সাফল্যের পরও হলিউডে নারী-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের সংখ্যা প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি বলে মনে করেন ডেভিস। তাঁর মতে, এসব সাফল্যকে শিল্পের পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে না দেখে ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
৪০ বছর পার হওয়ার পর তিনি আরও একটি বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তখন তাঁকে মূলত সাধারণ গৃহিণী বা পার্শ্বচরিত্রের প্রস্তাব দেওয়া হতো। এতে তিনি হতাশ হলেও থেমে থাকেননি। পরবর্তীতে টেলিভিশনের বিভিন্ন শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নতুনভাবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আন্দোলন
নিজের সন্তানদের সঙ্গে শিশুদের অনুষ্ঠান দেখার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, সেখানে নারী চরিত্রের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কম। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি গণমাধ্যমে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেন। পরে তিনি একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে নারী চরিত্রের উপস্থিতি ও উপস্থাপন নিয়ে তথ্যভিত্তিক কাজ করে। সেই গবেষণার ফলাফল শিল্পের অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
সংগ্রাম থেকে আত্মবিশ্বাস
ডেভিসের জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল মধ্যবয়সে এডিএইচডি শনাক্ত হওয়া। দীর্ঘদিন তিনি নিজের কিছু আচরণকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা মনে করতেন। পরে চিকিৎসাগত ব্যাখ্যা পাওয়ার পর তিনি নতুন আত্মবিশ্বাস অর্জন করেন। সেই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে তিরন্দাজির মতো নতুন দক্ষতা অর্জনে উৎসাহিত করে এবং সামাজিক নানা উদ্যোগে সক্রিয় হতে সাহায্য করে।
আজও গিনা ডেভিস মনে করেন, পর্দায় যেসব সাহসী, দৃঢ়চেতা এবং স্বাধীনচেতা নারী চরিত্র তিনি অভিনয় করেছেন, সেগুলো শুধু দর্শকদের নয়, তাঁকেও বদলে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, বাস্তব জীবনে শক্তিশালী হয়ে ওঠার আগেই তিনি পর্দায় সেই নারীদের জীবন যাপন করেছেন। আর সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে আজকের আত্মবিশ্বাসী মানুষে পরিণত করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















