কোনো রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা কিংবা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা, কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা বিরোধী কণ্ঠ দমনের ওপর নির্ভর করে না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শাসকগোষ্ঠী যখন জনঅসন্তোষকে রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে না দেখে নিরাপত্তা সমস্যায় রূপান্তরিত করে, তখন রাষ্ট্রের সংকট আরও গভীর হয়। আপাতদৃষ্টিতে কঠোরতা শাসকদের শক্তিশালী বলে মনে হলেও বাস্তবে তা প্রায়ই তাদের দুর্বলতার প্রকাশ।
আজ পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে ক্ষমতাসীনদের বিদেশ সফর ও কূটনৈতিক ব্যস্ততা অব্যাহত, অন্যদিকে দেশের ভেতরে নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চাপ এবং জনঅসন্তোষ ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক সংঘাত এবং প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি থাকলেও তার কার্যকর কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে একটি দায়িত্বশীল সরকার সাধারণত সমস্যার উৎস শনাক্ত করে রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজে। কিন্তু যখন সমস্যার অস্তিত্বই অস্বীকার করা হয় এবং সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন সংকটের সমাধান নয়, বরং তার বিস্তার ঘটে। বিরোধী রাজনীতি দমন, গণসমাবেশে বিধিনিষেধ, গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ কিংবা ডিজিটাল পরিসরে নজরদারি—এসব ব্যবস্থা সাময়িকভাবে চাপ কমাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলো রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে আরও ভঙ্গুর করে তোলে।
রাষ্ট্রের শক্তি নিয়ে পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরেই ‘হার্ড স্টেট’-এর ধারণা আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু একটি কঠোর রাষ্ট্র এবং একটি সক্ষম রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। কঠোর রাষ্ট্র বলপ্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু সক্ষম রাষ্ট্র মানুষের আস্থা অর্জন করে। কঠোর রাষ্ট্র ভয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সক্ষম রাষ্ট্র আইন, প্রতিষ্ঠান ও সুশাসনের মাধ্যমে বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে।
একটি কার্যকর রাষ্ট্রের পরিচয় তার দমনক্ষমতায় নয়; বরং কর আদায়ের দক্ষতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের মৌলিক সেবা দেওয়ার সক্ষমতায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে হতে হয় বিশ্বাসযোগ্য, কার্যকর এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত। জনগণের আস্থা ছাড়া এসব দায়িত্ব টেকসইভাবে পালন করা সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক, সাংবিধানিক পরিবর্তন, বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা, দীর্ঘ কারাবাস, সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো থাকলেও তার কার্যকর চর্চা দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত কেন্দ্রীভূত হয়েছে, জনআস্থা তত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
এখানেই ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মৌলিক পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্ষমতা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অর্জন করা যায়, কিন্তু কর্তৃত্ব আসে বৈধতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং জনস্বার্থে ক্ষমতার ব্যবহারের মাধ্যমে। কোনো সরকার প্রশাসনিক শক্তির জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে, কিন্তু জনগণ যদি সেই সিদ্ধান্তকে ন্যায্য বলে মনে না করে, তবে সেই ক্ষমতা কখনোই প্রকৃত কর্তৃত্বে রূপ নেয় না।

রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক মূলত সম্মতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই সম্মতি আসে তখনই, যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে সরকার আইনসম্মতভাবে, ন্যায়সংগত উদ্দেশ্যে এবং সবার স্বার্থ বিবেচনা করে ক্ষমতা ব্যবহার করছে। ভয়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা আনুগত্য আদায় করতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস অর্জন করতে পারে না।
পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিরোধী দলকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ বিরোধী রাজনীতিকে পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে পারেনি। সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হলেও তাদের জনসমর্থন অদৃশ্য হয়ে যায়নি। একইভাবে প্রচলিত গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সমালোচনা ও বিকল্প মত প্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায়ও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। প্রশ্ন হলো, কেবল সামরিক অভিযান ও কঠোর নিরাপত্তা কৌশলের ওপর নির্ভরতা কি বেলুচিস্তানে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে পেরেছে? বাস্তবতা বলছে, পারেনি। এর অর্থ এই নয় যে সশস্ত্র জঙ্গি সহিংসতার জবাব দেওয়া হবে না বা রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করবে না। কিন্তু শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগের নীতি কার্যকর হয়নি, কারণ এটি সংকটের গভীরে থাকা রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলোকে উপেক্ষা করেছে। দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বঞ্চনা, জনগণের ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ, প্রতিনিধিত্বহীন রাজনৈতিক কাঠামো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ—এসব প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকায় অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। ফলে বেলুচিস্তানে সংঘাত প্রশমিত হওয়ার বদলে আরও জটিল হয়েছে।
একই চিত্র আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরেও দেখা যাচ্ছে। সেখানে নিষেধাজ্ঞা, ধরপাকড় এবং কঠোর দমনমূলক ব্যবস্থা আন্দোলনকে স্তব্ধ করার পরিবর্তে বিক্ষোভকারীদের অবস্থান আরও কঠোর করেছে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে। অনেকের আশঙ্কা, এই ধরনের নীতি পাকিস্তানের অধিকৃত কাশ্মীর ইস্যুতে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থানকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
যে রাষ্ট্র নিজের জনগণের ওপর আস্থা রাখতে পারে না, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও আস্থা হারায়। তখন প্রশাসনের লক্ষ্য জনকল্যাণ থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতা সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অথচ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে জনগণকে অংশীদার করার মধ্যে, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে নয়।
গণতন্ত্রের মূল শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক মতভেদকে দমন নয়, ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হয়। বৈধতা ছাড়া নিরাপত্তা টেকসই হয় না, আর জনআস্থা ছাড়া রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। যে শাসনব্যবস্থা বিরোধিতাকে ভয় পায়, মতপ্রকাশকে সীমিত করে এবং নাগরিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে, সেটি বাইরে থেকে শক্তিশালী মনে হলেও ভেতরে ভেতরে অনিরাপদ হয়ে ওঠে।
অতএব রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার প্রকৃত পথ আরও কঠোর হওয়া নয়; বরং আরও সক্ষম, আরও জবাবদিহিমূলক এবং আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠা। কারণ দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা কখনোই ভয়ের ওপর দাঁড়ায় না। সেটি প্রতিষ্ঠিত হয় নাগরিকের আস্থা, আইনের শাসন এবং বৈধ রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ভিত্তির ওপর।
লেখক: সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক; যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত
মালিহা লোধি 



















