বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে এই জলপথকে কেন্দ্র করে নতুন আয়ের উৎস তৈরির উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
গত রোববার ইরানের প্রধান বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান মুসা রেজাই জানান, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে একটি নতুন বীমা কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এর আগে মে মাসে ইরান ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি নতুন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। সংস্থাটি সম্প্রতি প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে নিবন্ধন এবং নতুন বাধ্যতামূলক ইরানি বীমা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেয়। আপাতত এই বীমা বিনামূল্যে দেওয়া হলেও এর মেয়াদ সীমিত।
নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নতুন কৌশল
নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান পুরো হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। যদিও এই জলপথ ওমানের সঙ্গেও ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হয়, তবু নতুন নিয়মগুলো কার্যত ইরানের অনুমোদন ছাড়া চলাচলকে কঠিন করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচলের জন্য সরাসরি টোল আরোপ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই ইরান ‘সেবা’ বা ‘বীমা’ খাতে অর্থ আদায়ের পথ তৈরি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির পর নতুন বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার ঘোষণা আসে। তবে প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের নতুন বীমা ও নিবন্ধন ব্যবস্থা আলোচনার আগেই নতুন কর্তৃপক্ষের বৈধতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যে ৬০ দিনের বিনামূল্যের বীমা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তা যুদ্ধবিরতি চুক্তির সময়সীমার সঙ্গেও মিলে যায়। এরপর ইরান বীমা বাবদ অর্থ নেওয়া শুরু করতে পারে।

বিতর্কের কেন্দ্রে বীমা ব্যবস্থা
ইরানের নতুন বীমা কর্মসূচিতে হামলা, জাহাজ আটকে দেওয়া কিংবা নাবিকদের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের দাবি, এসব ঝুঁকির অনেকটাই সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় সৃষ্টি হয়েছে।
সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র কোনো অর্থপ্রদানকে ‘সেবা’ হিসেবে বর্ণনা করলেই তা বৈধ হয়ে যায় না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির মতো আন্তর্জাতিক নৌপথে স্বাভাবিক যাতায়াতের ওপর বাধ্যতামূলক টোল আরোপের ভিত্তি নেই।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) জানিয়েছে, ইরানের নতুন বীমা নির্দেশনা তাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়নি এবং এটি কোনো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়। সংস্থাটি আরও বলেছে, উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলের অধিকার স্থগিত বা বাধাগ্রস্ত করতে পারে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মে মাসের শেষ দিকে পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই সংস্থা জাহাজগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে ইরানের কর্মকাণ্ডকে অর্থায়নের চেষ্টা করছে। ফলে ভবিষ্যতে ইরানি বীমা ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্যও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অনিশ্চয়তায় বৈশ্বিক শিপিং খাত
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন নিয়ম, চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এবং সম্ভাব্য আর্থিক বাধ্যবাধকতার কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং খাত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো ব্যবস্থায় ফেরার সুযোগ নেই, আবার ভবিষ্যৎ কাঠামোও এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যপথে নতুন এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে ইরান, নতুন বীমা ও নিবন্ধন ব্যবস্থায় বৈশ্বিক শিপিং খাতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















