নতুন করে ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতির যে অধ্যায় শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: বর্তমান ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে কি সংস্কার ও সমঝোতার মাধ্যমে বদলানো সম্ভব, নাকি স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন শাসনব্যবস্থার পূর্ণ রূপান্তর?
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের ক্ষমতাকাঠামো সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিনের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশটির নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা এত স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে পশ্চিমা বিশ্বের একটি অংশ, বিশেষত ওয়াশিংটন, এমন একটি পথে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে যা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সময় ও পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে পারে।
এখানেই বিতর্কের সূত্রপাত। সমালোচকদের মতে, চাপ প্রয়োগ করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই চাপের রাজনৈতিক লক্ষ্য কী। যদি একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করা হয় কিন্তু তার পরিবর্তে কী ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না থাকে, তবে পুরো কৌশলটি শেষ পর্যন্ত নিজের শক্তি হারায়।
ইরানের ক্ষেত্রে বহু বছর ধরেই পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের একটি প্রবণতা দেখা গেছে। তারা ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সম্ভাব্য পরিবর্তনের বাহক হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু বাস্তবে এই গোষ্ঠীগুলো কতটা স্বাধীন এবং কতটা একই কাঠামোর অংশ—সেই প্রশ্ন কখনও পুরোপুরি দূর হয়নি।

মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনা এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। সমালোচকদের যুক্তি হলো, তিনি কোনো নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধি নন; বরং দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ক্ষমতা কাঠামোর অংশ। ফলে তাঁর মাধ্যমে আলোচনার অর্থ প্রকৃত পরিবর্তনের চেয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে নতুন ভাষায় উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করা।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে সময়ই হয়ে ওঠে তেহরানের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যদি আন্তর্জাতিক চাপকে সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া যায়, তবে রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করতে পারে, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়ই শুধু ঘোষণার দিকে নয়, কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার দিকেও নজর রাখে। যদি কোনো রাষ্ট্র একদিকে কঠোর অবস্থান নেয় এবং অন্যদিকে সংকটের চূড়ান্ত মুহূর্তে আপসের পথ বেছে নেয়, তবে তা ভবিষ্যতের সংঘাতগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে কেবল একটি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং একটি কাঠামোগত নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। ফলে ওয়াশিংটন যদি বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতরের কোনো অংশের সঙ্গে সমঝোতার পথ খোঁজে এবং ইসরায়েল যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন লক্ষ্য অনুসরণ করে, তাহলে কৌশলগত সমন্বয় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের অবস্থান এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তাঁর প্রশাসন প্রকাশ্যে ইরানের জনগণের প্রতি সমর্থনের বার্তা দিয়েছিল এবং ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছিল। সেই অবস্থান থেকে যদি এখন নীতিগত পরিবর্তন ঘটে থাকে, তাহলে সমর্থকদের একাংশের কাছে তা কৌশলগত ধারাবাহিকতার প্রশ্ন তুলবে।
তবে সমগ্র বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আরও বড় একটি বিষয়—ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির নাম প্রায়ই আলোচনায় আসে। তাঁর সমর্থকেরা দাবি করেন, তিনি দেশের ভেতরে ও প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন এবং একটি সম্ভাব্য উত্তরণ-পর্বের রাজনৈতিক কাঠামো দিতে সক্ষম। অন্যদিকে সমালোচকেরা মনে করেন, কোনো বিকল্প নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাস্তবে কতটা বিস্তৃত, তা এখনও পরীক্ষিত নয়।
তবু একটি বিষয় স্পষ্ট: ইরান প্রশ্নে সিদ্ধান্তের মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। যদি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো বিদ্যমান ব্যবস্থাকে পুনরায় বৈধতা দেওয়ার পথ বেছে নেয়, তবে বর্তমান কাঠামো আরও দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। আর যদি তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনকে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের সূচনা হতে পারে।
এই কারণেই আজকের বিতর্ক কেবল একটি চুক্তি বা কূটনৈতিক সমঝোতাকে ঘিরে নয়। এটি মূলত সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে—ইরানের ভবিষ্যৎ কি সংস্কারের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, নাকি একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের মাধ্যমে?

সিয়াভাশ গোলামি 



















