বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত চালু হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। এর আগে নতুন করে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে চলমান এমওইউ সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সংশোধন কিংবা নতুন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে প্রয়োজন হবে আরও আলোচনা ও প্রক্রিয়াগত কাজ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরে বিষয়টি গুরুত্ব পায়। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দেশ একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে একমত হয়। এই গ্রুপ বর্তমান এমওইউ পর্যালোচনা করবে এবং বর্তমান বাস্তবতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে কাজ করবে।
সমঝোতা সংশোধন নাকি নতুন চুক্তি
জনশক্তি রপ্তানি খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নতুন করে এমওইউ স্বাক্ষরের চেয়ে বিদ্যমান চুক্তি সংশোধন করা হলে শ্রমবাজার দ্রুত চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ বর্তমান এমওইউ স্বাক্ষরের আগে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা হয়েছিল এবং ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পাঁচ বছরের জন্য এটি কার্যকর করা হয়।

এদিকে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সংসদে জানিয়েছেন, সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর জন্য কাজ করছে। একইভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব
দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী করার বিষয়ে একমত হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমিয়ে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান মালয়েশিয়ার কাছে দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানান। অন্যদিকে আনোয়ার ইব্রাহিম স্পষ্টভাবে বলেন, বিদেশি কর্মীদের শোষণ, প্রতারণা কিংবা শুধু মুনাফার জন্য ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিকদের অধিকার ও পরিবারের স্বার্থ রক্ষাকে তিনি অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।
বাংলাদেশের জন্য বারবার বন্ধ হওয়া শ্রমবাজার
জনশক্তি খাতের অভিজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্থিতিশীলতার অভাব। নব্বইয়ের দশক থেকে দেশটির শ্রমবাজার যতদিন বাংলাদেশিদের জন্য খোলা থেকেছে, তার চেয়ে বেশি সময় বন্ধ ছিল।

২০০৯ সালে কর্মী নিয়োগ বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালে আবার চালু হয়। পরে ২০১৮ সালে পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালের আগস্টে কর্মী পাঠানো শুরু হলেও ২০২৪ সালের মে মাসে আবার তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। অথচ মালয়েশিয়া একই সময়ে অন্যান্য উৎস দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।
সিন্ডিকেট ও অনিয়মের অভিযোগ
শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেট ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় দেড় হাজার রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠানো হলেও মালয়েশিয়া মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেয়। এই নির্বাচন কীভাবে করা হয়েছিল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা কখনও দেওয়া হয়নি।
এ সময় কর্মীপ্রতি নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগও ওঠে। অনেক কর্মী বিপুল টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় গিয়েও প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ভুয়া চাহিদাপত্র ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনাও সামনে আসে।

এবার কী হতে পারে
আগামী মাসে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর. রামানানের ঢাকা সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে নৈতিক, স্বচ্ছ ও শোষণমুক্ত নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আলোচনা আরও এগিয়ে নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যমান এমওইউ সংশোধন করে এজেন্সি বাছাই ও অটো রোটেশনসংক্রান্ত বিতর্কিত শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা গেলে সিন্ডিকেটের প্রভাব কমতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মালয়েশিয়া অন্য দেশ থেকে কর্মী নিলে বাংলাদেশ থেকেও যেন নিয়মিত নিয়োগ দেওয়া হয়, সে ধরনের একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের জন্য এখনও বেশ কিছু ধাপ বাকি রয়েছে। ফলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার শীঘ্রই খুলে যাচ্ছে—এমন আশা আপাতত করা যাচ্ছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















