ফিলিপাইনের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা কিডলাত তাহিমিক দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় প্রস্তাবিত পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের প্রতিবাদে নিজের জাতীয় শিল্পী সম্মাননার পদক ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি এই সম্মাননার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধাও ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার এই পদক্ষেপ দেশজুড়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষা সংস্কার ঘিরে বিতর্ক
প্রস্তাবিত নতুন সাধারণ শিক্ষা পাঠ্যক্রম অনুযায়ী কলেজ পর্যায়ের সাধারণ শিক্ষা বিষয়ের ক্রেডিট সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পাশাপাশি কয়েকটি বিষয় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে স্থানান্তরের কথাও বলা হয়। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষায়িত ও ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য আরও বেশি সময় বরাদ্দ করার সুযোগ তৈরি হতো।
তবে শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক, শিল্পী এবং বিভিন্ন একাডেমিক সংগঠন এই পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেন। তাদের মতে, এতে মানবিক শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও সামাজিক চেতনা বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হবে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনার জন্য স্থগিত করে।
‘শুধু দক্ষতা নয়, মানুষ গড়াও জরুরি’
কিডলাত তাহিমিক তার প্রতিবাদপত্রে বলেন, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশ এমন এক পথে এগোচ্ছে যেখানে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক কর্মী তৈরি করা। তার মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষাকে সংকীর্ণ করে ফেলছে এবং মানুষের সামগ্রিক বিকাশকে উপেক্ষা করছে।
তিনি যুক্তি দেন, শিক্ষা কেবল পড়া, লেখা ও গণনার দক্ষতা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মানবিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের মতো বিষয়গুলোও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন উদ্বেগ
তার বক্তব্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে মানবিক শিক্ষা আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। কারণ কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, মানুষের সহমর্মিতা, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক চেতনা ভবিষ্যতের সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি শিক্ষাব্যবস্থা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং বাজারের চাহিদা পূরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে পদক ফেরত
কিডলাত তাহিমিক জানান, তার এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা বা সম্মান প্রত্যাখ্যানের জন্য নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরার একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। তিনি এটিকে এক ধরনের নৈতিক অবস্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি শিক্ষা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান।
তার ভাষায়, একটি দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সামাজিক চেতনাকে পাঠ্যক্রমের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। তাই শিক্ষার আলোকে আরও বিস্তৃত ও মানবিক করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়ে এই প্রতিবাদ এখন ফিলিপাইনের একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
মানবিক শিক্ষা কমানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে জাতীয় শিল্পীর পদক ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন কিডলাত তাহিমিক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















