জ্বালানির দাম কমছে, বাণিজ্য সংঘাতের চাপও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির জন্য নতুন একটি উৎস সামনে এসেছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যকেন্দ্র, উন্নত চিপ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগের ফলে স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বিল পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে খরচ বাড়তে শুরু করেছে।
প্রযুক্তি খাতে নজিরবিহীন বিনিয়োগ
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করছে। চলতি বছরে শীর্ষ পাঁচ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মূলধনী বিনিয়োগ কয়েকশ’ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং যন্ত্রপাতি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক এবং ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো গড়ে তুলতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, তা বিশ্বের অনেক বড় সম্পদবাজারের মোট মূল্যেরও কয়েকগুণ বেশি হতে পারে।
প্রযুক্তিপণ্যের দাম বাড়ার কারণ
এই বিপুল চাহিদার কারণে স্মৃতি সংরক্ষণ ও তথ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত চিপের দাম বেড়েছে। একই ধরনের চিপ আবার গাড়ি, গেমিং ডিভাইস, স্মার্টফোন এবং অন্যান্য ভোক্তা প্রযুক্তিপণ্যেও ব্যবহৃত হয়। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ছে ভোক্তার পকেটে।
বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তাদের পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। শিল্পখাতের নির্বাহীদের মতে, সাম্প্রতিক ব্যয় বৃদ্ধি গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র।
স্বল্পমেয়াদে চাপ, দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনা
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করতে পারে। অতীতের বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলোও শেষ পর্যন্ত একই ধরনের ফল দিয়েছে। উৎপাদন দক্ষতা বাড়লে প্রতিষ্ঠানগুলো কম খরচে বেশি পণ্য ও সেবা দিতে পারে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ কমায়।
তবে সেই সুফল পেতে সময় লাগবে। বিশ্লেষকদের মতে, অন্তত কয়েক বছর আগে পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূল্যস্ফীতি কমানোর মতো অবস্থানে পৌঁছাবে না। বরং বর্তমানে অবকাঠামো নির্মাণের চাহিদা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
![]()
বিদ্যুৎ ও শ্রমবাজারে বাড়তি চাপ
নতুন তথ্যকেন্দ্র চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের যে প্রবৃদ্ধি হবে, তার বড় অংশ আসবে তথ্যকেন্দ্র থেকে। ফলে বিদ্যুতের খুচরা মূল্যও ধারাবাহিকভাবে বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মজুরিও বাড়ছে। বৈদ্যুতিক সংযোগ ও অবকাঠামো স্থাপনের সঙ্গে জড়িত কর্মীদের আয় অন্যান্য খাতের শ্রমিকদের তুলনায় দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির নতুন বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর বিনিয়োগ মূল্যস্ফীতিকে হঠাৎ বিস্ফোরণমুখী করে তুলবে না। কারণ প্রযুক্তিপণ্য ও বিদ্যুৎ মানুষের মোট ব্যয়ের তুলনায় এখনও সীমিত অংশজুড়ে রয়েছে। তবে এটি দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতিকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ওপরে ধরে রাখতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি মানুষ বারবার নতুন নতুন কারণে মূল্যবৃদ্ধি দেখতে থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে—এমন প্রত্যাশা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আর সেটিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাই শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং ভোক্তা ব্যয়ের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের কারণে প্রযুক্তিপণ্য, বিদ্যুৎ ও শ্রম ব্যয় বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
জাস্টিন লাহার্ট 



















