বিশ্বজুড়ে নগর পরিকল্পনার আলোচনায় গত দুই দশক ধরে একটি শব্দ বারবার ফিরে এসেছে—‘স্মার্ট সিটি’। তথ্যপ্রযুক্তি, সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর সমন্বয়ে এমন শহর গড়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, যা হবে দ্রুততর, দক্ষতর এবং আরও কার্যকর। যানজট কমবে, জ্বালানির অপচয় হ্রাস পাবে, সরকারি সেবা হবে সহজ ও নির্ভুল, আর শহর পরিচালনা হবে বাস্তবসম্মত তথ্যের ভিত্তিতে।
এই লক্ষ্যগুলোর অনেকটাই ইতোমধ্যে বাস্তবে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের নানা শহরে নাগরিকরা এখন রিয়েল-টাইম পরিবহন তথ্য পাচ্ছেন, অনলাইনে সরকারি সেবা গ্রহণ করছেন, আর পরিকল্পনাবিদেরা উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে ভবিষ্যৎ চাহিদা অনুমান করতে পারছেন। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে জননিরাপত্তা পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও বাড়ছে।
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমশ সামনে চলে আসছে—শুধু ‘স্মার্ট’ হওয়াই কি যথেষ্ট?
উত্তরটি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে: না।
প্রযুক্তি সমাধান দিতে পারে, কিন্তু সব সমস্যার উত্তর দিতে পারে না। কারণ শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো কেবল প্রযুক্তিগত নয়। সেগুলো একই সঙ্গে সামাজিক, নৈতিক এবং রাজনৈতিক। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কোন খাতে কতটা ত্যাগ স্বীকার করা হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্ত কতটা ন্যায়সঙ্গত, বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর জন্য কেমন সেবা কাঠামো দরকার, কিংবা ক্রমবর্ধমান বৈষম্য কীভাবে সামাজিক সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর অ্যালগরিদম একা দিতে পারে না।
এখানেই ‘ওয়াইজ সিটি’ বা প্রজ্ঞাবান শহরের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্মার্ট সিটি মূলত সক্ষমতার প্রশ্ন। একটি শহর কত দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, কত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে, কিংবা কত দক্ষতার সঙ্গে সেবা পরিচালনা করতে পারে—এসব তার পরিমাপ। কিন্তু প্রজ্ঞাবান শহর বিচার করে অন্য বিষয়। সেই শহর জানতে চায়, সিদ্ধান্তের সুফল কারা পাচ্ছে, কারা বঞ্চিত হচ্ছে, এবং দীর্ঘমেয়াদে সেই সিদ্ধান্তের সামাজিক প্রভাব কী হবে।
একটি স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থা হয়তো শহরের দ্রুততম পথ নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু একটি প্রজ্ঞাবান শহর জানতে চাইবে, সব নাগরিক কি সমানভাবে যাতায়াত সুবিধা পাচ্ছেন? একটি অ্যালগরিদম হয়তো সম্পদ বণ্টনের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি বের করতে পারে। কিন্তু প্রজ্ঞাবান প্রশাসন বিবেচনা করবে, সেই বণ্টন কি ন্যায্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক?
ডেটা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। প্রযুক্তি যত বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছে, তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কোন তথ্য সংগ্রহ করা উচিত, কেন করা উচিত এবং সেই তথ্যের ব্যবহার কতটা গ্রহণযোগ্য। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখানে মূল বিষয় নয়; মূল বিষয় হচ্ছে বিচক্ষণতা।
শহর নির্মাণের আরেকটি মৌলিক প্রশ্নও নতুন করে ভাবতে হবে—আমরা আসলে কার জন্য শহর গড়ছি?
যদি লক্ষ্য হয় কেবল সর্বোচ্চ দক্ষতা, তবে সোজা রাস্তা, দ্রুত গতি এবং সর্বনিম্ন সময়ই হবে প্রধান বিবেচনা। কিন্তু মানুষ কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য শহরে বাস করে না। মানুষ চায় অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, অবকাশ এবং চিন্তার সুযোগ। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় উদ্যানগুলোতে বাঁকানো পথ, খোলা সবুজ পরিসর এবং থেমে থাকার জায়গা থাকে কারণ সেগুলো মানুষকে ধীর হতে, চারপাশকে দেখতে এবং নিজেকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
একটি শহর যদি শুধুই দক্ষতার যন্ত্রে পরিণত হয়, তবে সেখানে মানবিকতার জায়গা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। নগরজীবনের মান নির্ধারিত হয় কেবল কত দ্রুত কাজ সম্পন্ন হচ্ছে তার মাধ্যমে নয়; বরং মানুষ কতটা নিরাপদ, সংযুক্ত, সম্মানিত এবং অন্তর্ভুক্ত বোধ করছে তার মাধ্যমেও।
ডিজিটাল যুগে শহরগুলো নিঃসন্দেহে আরও তথ্যসমৃদ্ধ হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও শক্তিশালী হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আরও বেশি প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম তৈরি হবে। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য যত বাড়বে, বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের প্রয়োজনও তত বাড়বে।
আগামী দিনের সফল শহর সেই শহর হবে না, যে সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। বরং সেই শহর হবে, যে প্রযুক্তিকে মানবিক উদ্দেশ্যের অধীন রাখতে পারে; যে দক্ষতার পাশাপাশি ন্যায়বিচারকে মূল্য দেয়; এবং যে উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে শুধু গতি নয়, মানুষের কল্যাণকেও সমান গুরুত্ব দেয়।
শহরের ভবিষ্যৎ তাই শুধু স্মার্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো প্রজ্ঞাবান হওয়া। কারণ প্রযুক্তি আমাদের কী করা সম্ভব, তা বলে দেয়; কিন্তু কী করা উচিত, সেই উত্তর এখনো মানুষের বিচারবোধের কাছেই রয়ে গেছে।
লিলি কং 



















