স্তন ক্যানসারের সবচেয়ে জটিল ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ধরনগুলোর একটি ‘ট্রিপল-নেগেটিভ’ ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন আশার খবর এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের হাতে কার্যকর বিকল্প খুবই সীমিত ছিল। তবে নতুন প্রজন্মের দুটি ওষুধ রোগের অগ্রগতি ধীর করতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, যা কেমোথেরাপির তুলনায় অনেক ভালো ফল দিচ্ছে।
নতুন অনুমোদন, নতুন সম্ভাবনা
সম্প্রতি উন্নত পর্যায়ের ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নতুন রোগীদের জন্য একটি নতুন ওষুধ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর আগে একই ধরনের আরেকটি ওষুধও অনুমোদন পেয়েছিল। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে এই কঠিন রোগের চিকিৎসায় দুটি নতুন বিকল্প যুক্ত হলো।
দুটি ওষুধই লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির অংশ। এগুলো ক্যানসার কোষকে শনাক্ত করে সরাসরি সেখানে ওষুধ পৌঁছে দেয়। ফলে পুরো শরীরের সুস্থ কোষের ওপর কেমোথেরাপির মতো ব্যাপক আঘাত না করে নির্দিষ্টভাবে টিউমারের বিরুদ্ধে কাজ করা সম্ভব হয়।
কেমোথেরাপির তুলনায় ভালো ফল
গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন ওষুধগুলো রোগের অগ্রগতি বা টিউমার বৃদ্ধির ঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে প্রথম চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই রোগ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক রোগী পরবর্তী ধাপের চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগই পান না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক অগ্রগতি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। বহু বছর ধরে যেখানে বড় ধরনের সাফল্য ছিল না, সেখানে এখন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি রোগীদের সামনে বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করছে।
রোগীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যানসার সাধারণত তুলনামূলক কম বয়সী নারী এবং কিছু নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি দেখা যায়। উন্নত পর্যায়ে পৌঁছে গেলে রোগীদের গড় আয়ু সাধারণত দুই বছরেরও কম হয়ে থাকে।
এই রোগের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত ফিরে আসার প্রবণতা। অন্যান্য অনেক স্তন ক্যানসারের তুলনায় এটি কম সময়ে পুনরায় দেখা দিতে পারে এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল
নতুন ওষুধগুলোর ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, এককভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও টিউমারের বৃদ্ধি বা মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আবার কিছু রোগীর ক্ষেত্রে রোগপ্রতিরোধী চিকিৎসার সঙ্গে সমন্বয়ে আরও ভালো ফল পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী আরেকটি ওষুধও রোগের অগ্রগতি কমানোর পাশাপাশি রোগীদের গড় বেঁচে থাকার সময় কয়েক মাস পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। তবে দুটি ওষুধের মধ্যে সরাসরি তুলনামূলক গবেষণা এখনো হয়নি। ফলে কোনটি বেশি কার্যকর, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
এক রোগীর লড়াই
২০২৩ সালে এক নারী জানতে পারেন যে তার ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যানসার শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসকেরা তাকে নতুন ওষুধের একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তার টিউমার ছোট হতে শুরু করে।
পরে অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন এবং পুনরায় চিকিৎসার মধ্য দিয়ে গেলেও সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, তার ক্যানসার এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে এবং টিউমারের আকার কমছে। তিনি এখন চিকিৎসার ফাঁকে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারছেন এবং নাতি-নাতনিদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।
ভবিষ্যৎ গবেষণার দিক
গবেষকেরা এখন এই ওষুধগুলো রোগের আরও প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবহারের সম্ভাবনা পরীক্ষা করছেন। অস্ত্রোপচারের আগে টিউমার ছোট করা কিংবা অস্ত্রোপচারের পর অবশিষ্ট ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার ক্ষেত্রেও এগুলো কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের আশা, উন্নত পর্যায়ে যে সাফল্য দেখা যাচ্ছে, তা যদি রোগের প্রাথমিক ধাপেও পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বেশি রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
স্তন ক্যানসারের আক্রমণাত্মক ধরনে নতুন লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ কেমোথেরাপির চেয়ে ভালো ফল দেখাচ্ছে, বাড়ছে রোগীদের বাঁচার আশা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















