বিশ্ব রাজনীতিতে কখনও কখনও একটি চুক্তি বাস্তবতার চেয়ে বড় আশা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা সেই ধরনের একটি ঘটনা। কয়েক দশকের বৈরিতা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার পর ওয়াশিংটন যখন তেহরানকে সীমিত সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সুযোগ দিয়েছে, তখন অনেকের চোখে এটি নতুন যুগের সূচনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা কি সত্যিই ইরানের অর্থনীতিকে মুক্তির পথে নিয়ে যাবে, নাকি এটি দীর্ঘ ও জটিল একটি প্রক্রিয়ার কেবল প্রথম ধাপ?
ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো কোনো একক সিদ্ধান্তের ফল নয়। এগুলো গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জিম্মি সংকট থেকে শুরু করে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং মানবাধিকার ইস্যু—সবকিছু মিলিয়ে একের পর এক আইন, নির্বাহী আদেশ ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞার কাঠামো তৈরি হয়েছে। ফলে এগুলো অপসারণ করাও একইভাবে বহুস্তরীয় এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর।
সাম্প্রতিক সমঝোতার আওতায় ইরানি তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে অস্থায়ী ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে ইরান কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু এই অর্থপ্রবাহকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সূচনা হিসেবে দেখা এখনও সময়ের আগে হবে।
কারণ সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং নিষেধাজ্ঞার চারপাশে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার পরিবেশ। আন্তর্জাতিক ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীরা বছরের পর বছর ধরে ইরানকে উচ্চ ঝুঁকির বাজার হিসেবে বিবেচনা করেছে। হঠাৎ কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা তাদের সেই ধারণা বদলে দিতে পারে না। ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত সাধারণত ঘোষণার ভিত্তিতে নয়, স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে নেওয়া হয়।
আরও বড় বাধা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামোতে। কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতায় আরোপ করা হয়েছে, যা প্রশাসন চাইলে প্রত্যাহার করতে পারে। কিন্তু বহু গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা সরাসরি কংগ্রেসের আইনে অন্তর্ভুক্ত। সেগুলো বাতিল বা সংশোধনের জন্য আইনপ্রণেতাদের সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা সহজ হবে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে হামাস, হিজবুল্লাহ বা অন্যান্য গোষ্ঠীকে ঘিরে মার্কিন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা অত্যন্ত বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক মাত্রাটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র একা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন ব্যবস্থাও এখনও কার্যকর। ফলে ওয়াশিংটন কোনো পদক্ষেপ নিলেই বৈশ্বিক আর্থিক ও বাণিজ্যিক পরিবেশ সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাবে না। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে একাধিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং আইনি ঝুঁকির মধ্যে চলতে হবে।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা উপেক্ষা করা যায় না। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার মানেই আন্তর্জাতিক পুঁজি ইরানের দিকে ছুটে যাবে—এ ধারণা অতিরঞ্জিত। বিনিয়োগকারীরা শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নয়, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও মূল্যায়ন করে। যদি তারা মনে করে আগামী নির্বাচন, প্রশাসনিক পরিবর্তন বা আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে আবারও নিষেধাজ্ঞা ফিরে আসতে পারে, তাহলে তারা বড় অঙ্কের বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না।
ইরানের জন্য তাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণায় নয়, সেই ঘোষণাকে বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ায়। তেল বিক্রি বাড়ানো তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পূর্ণ প্রবেশাধিকার, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক আস্থা পুনর্গঠন অনেক কঠিন কাজ।
সাম্প্রতিক সমঝোতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা নিষেধাজ্ঞার জাল কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে খুলে যাবে না। আইনি বাধা, রাজনৈতিক বিরোধ, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং বাজারের আস্থাহীনতা—সবকিছু মিলিয়ে সামনে দীর্ঘ পথ অপেক্ষা করছে।
সুতরাং ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়েছে কি না, তা নয়; বরং এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী এবং কতটা বিশ্বাসযোগ্য। সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে তেহরানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সত্যিই বদলাবে কি না।
আন্দ্রেয়া শালাল ও টিমোথি গার্ডনার 



















