ইরান যুদ্ধ অবসানের প্রাথমিক সমঝোতা কার্যকর থাকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার পর। এই ঘটনার জেরে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তার জন্য পরিচালিত এসকর্ট কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
তাইওয়ানের শিপিং কোম্পানি এভারগ্রিন মেরিন জানিয়েছে, তাদের সিঙ্গাপুর পতাকাবাহী জাহাজ ‘এভার লাভলি’ ওমান উপকূলের কাছে একটি অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজটি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিওর সুপারিশকৃত রুটে চলছিল। হামলায় জাহাজের ডান পাশ ও ব্রিজের জানালাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নাবিক ও পণ্যসম্ভার নিরাপদ রয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
দুই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, জাহাজটিতে ইরানের পক্ষ থেকে গুলি চালানো হয়েছিল। যদিও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি তেহরান। নিরাপত্তা সূত্রের ধারণা, ড্রোনের মাধ্যমেও হামলাটি হয়ে থাকতে পারে।
ইরানের নতুন নির্দেশনা নিয়ে উদ্বেগ
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে যুদ্ধ শুরুর পর ইরান যে কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে, তারা জানিয়েছে নির্ধারিত রুটের বাইরে চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে না। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, অনুমোদনহীন পথে চলাচলের ফলে যে কোনো ঝুঁকির দায় জাহাজ মালিক, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও অধিনায়কের ওপর বর্তাবে।
একই সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও জানিয়েছে, কেবল তাদের নির্ধারিত রুট ব্যবহার করলেই নিরাপদ চলাচল সম্ভব হবে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুটি পানামা-নিবন্ধিত জাহাজকেও গতিপথ পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইএমওর উদ্যোগে সাময়িক বিরতি
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে শত শত জাহাজ ও হাজারো নাবিক আটকে পড়েছিল। তাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে আইএমও সম্প্রতি একটি স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগ চালু করে। এর আওতায় ইরান ও ওমানের জলসীমা ব্যবহার করে দুটি নির্ধারিত রুটে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক হামলার পর সংস্থাটি জানিয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এখনও কার্যকর আছে কি না তা পুনরায় যাচাই করতে এই কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। আইএমও আরও বলেছে, হামলার শিকার জাহাজটি তাদের সরিয়ে নেওয়ার কর্মসূচির অংশ ছিল না।
তেলবাজারে স্বস্তি, রপ্তানি বাড়ানোর প্রস্তুতি
যুদ্ধের আগে বিশ্বের দৈনিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। যুদ্ধ শুরুর পর এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ কার্যত বেড়ে যায়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আটকে থাকা আরও কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকার প্রণালি ছাড়তে শুরু করায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও কিছুটা কমেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও জানিয়েছে, তাদের আরও কয়েকটি জাহাজ নিরাপদে প্রণালি ত্যাগ করেছে।
এদিকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো প্রায় চার মাস পর আবারও রাস তানুরা টার্মিনালে তেল লোডিং শুরু করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম এই তেলবন্দরে সৌদি শিপিং কোম্পানি বাহরির নিয়ন্ত্রিত একাধিক বৃহৎ তেলবাহী জাহাজকে তেল বোঝাই করতে দেখা গেছে।
সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপসাগরীয় দেশগুলোকে আশ্বস্ত করার সফর শেষে বলেছেন, ইরান যদি আবারও জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে পরিস্থিতি নতুন সংকটের দিকে যেতে পারে।
অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির কাঠামো নিয়ে এখনও বিভিন্ন প্রশ্ন রয়ে গেছে। ইরানের জন্য আর্থিক প্রণোদনা, পারমাণবিক কর্মসূচি তদারকি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং লেবাননে চলমান সংঘাত—এসব ইস্যুতে মতপার্থক্য বজায় রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় এসব জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে সর্বশেষ এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল হয়েছে, সে বিষয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
#হরমুজ_প্রণালি #ইরান #মধ্যপ্রাচ্য #তেলবাজার #আইএমও #সামুদ্রিক_নিরাপত্তা #সৌদি_আরব #এভারগ্রিন_মেরিন #বিশ্বঅর্থনীতি #আন্তর্জাতিক_সংবাদ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















