ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের সিদ্ধান্তের ১০ বছর পূর্ণ হলেও দেশটি এখনো সেই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ২০১৬ সালের গণভোটে অল্প ব্যবধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায় দেওয়ার পর থেকে অর্থনীতি, রাজনীতি, বাণিজ্য, অভিবাসন ও সামাজিক জীবনের নানা ক্ষেত্রে গভীর পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেক্সিটের প্রতিশ্রুত অনেক সুবিধা এখনো বাস্তবে রূপ পায়নি, বরং নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘ অধ্যায়
ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অঙ্গন সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে। গণভোটের ফলাফলের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। এরপর একের পর এক সরকারপ্রধান নানা সংকটের মুখে পড়েন। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ সেই ধারাবাহিকতার নতুন উদাহরণ।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্রিটেনের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অর্থনীতি, অবকাঠামো ও জনসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে স্থায়ী সমাধান অধরাই রয়ে গেছে।
অর্থনীতিতে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক
ব্রেক্সিট সমর্থকেরা মনে করেছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলে ব্রিটেনের অর্থনীতি আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য এখনো অব্যাহত থাকলেও আগের তুলনায় কমেছে। রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা, সীমান্ত প্রক্রিয়া ও পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়ও সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অভিবাসন নীতিতে উল্টো চিত্র
ব্রেক্সিট প্রচারণার সময় অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় ব্রিটেনকে ইউরোপের বাইরের দেশগুলো থেকে ব্যাপক সংখ্যক কর্মী ও শিক্ষার্থী গ্রহণ করতে হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা খাত এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি কর্মী ও শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পরে জনমতের চাপে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আনা হলে আগমন কমতে শুরু করে।
ইউরোপে ফেরার পক্ষে জনমত বাড়ছে
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্রিটিশ নাগরিক আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন। এমনকি যারা একসময় ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যেও মত পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অনেক নাগরিক মনে করেন, ব্রেক্সিট প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। অর্থনৈতিক সুযোগ কমেছে, আন্তর্জাতিক প্রভাব আগের মতো নেই এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ফলে ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার আলোচনা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনো জটিল। ব্রেক্সিট প্রশ্নে নতুন বিতর্ক শুরু করতে বড় দলগুলোর অনেক নেতাই অনিচ্ছুক। কারণ বিষয়টি এখনো সমাজ ও রাজনীতিতে বিভাজনের অন্যতম প্রধান উৎস।
বিভক্তির উত্তরাধিকার
এক দশক পরও ব্রেক্সিট শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ব্রিটেনের জাতীয় পরিচয়, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে। ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত দেশটির জন্য কতটা লাভজনক ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ব্রেক্সিটের প্রভাব ব্রিটেনের রাজনীতি ও সমাজে বহু বছর ধরে অনুভূত হবে।
ব্রেক্সিটের ১০ বছর পরও ব্রিটেনে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ইউরোপে ফেরার বিতর্ক নতুন করে আলোচনায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















