বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক সময় পার করছে যখন প্রবৃদ্ধি মন্থর, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র, আর প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ক্রমেই রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও নীতিনির্ধারণী মহলে একটি নতুন ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে—‘চায়না অপারচুনিটি ২.০’। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক স্লোগান নয়; বরং বিশ্বায়নের পরবর্তী ধাপ নিয়ে একটি বৃহত্তর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
একসময় চীনের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহের মূল কারণ ছিল তার বিশাল বাজার, সস্তা শ্রম এবং উৎপাদন সক্ষমতা। কিন্তু সেই বাস্তবতা বদলেছে। আজকের চীনকে বোঝার জন্য কেবল কারখানা, রপ্তানি বা ভোক্তা বাজারের দিকে তাকালে চলবে না। বরং নজর দিতে হবে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, শিল্পোন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় তার পরিবর্তনশীল ভূমিকায়।
চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থানকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশটি এখন শুধু উৎপাদন কেন্দ্র নয়; এটি উদ্ভাবনেরও একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন, ব্যাটারি প্রযুক্তি, সৌরশক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস এবং বায়োফার্মাসিউটিক্যাল খাতে চীনের অগ্রগতি বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য চীনের গুরুত্ব আর শুধু পণ্য বিক্রির বাজার হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি গবেষণা, উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতারও একটি প্রধান ক্ষেত্র।
বিশ্বায়নের বর্তমান সংকটকে বুঝতে হলে আরেকটি বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু দেশ নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা, শুল্ক এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার পথে হাঁটছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল আরও ভঙ্গুর হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় যে দেশ বৃহৎ বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, সে স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক পুঁজি ও ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চীনের পক্ষে যুক্তি হলো, তারা এখনও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য, উন্মুক্ত বাজার এবং আন্তঃসংযুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান ধরে রেখেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, আমদানি প্রদর্শনী এবং সরবরাহ শৃঙ্খলভিত্তিক সহযোগিতা উদ্যোগের মাধ্যমে বেইজিং বারবার সংকেত দিচ্ছে যে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে চায়। এই বার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন এক সময়ে, যখন অনেক রাষ্ট্র অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে উন্মুক্ততার নীতি থেকে সরে আসছে।

তবে ‘চায়না অপারচুনিটি ২.০’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক। এটি বিশ্বায়নের নিয়ম ও সুবিধা কারা ভোগ করবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। গত কয়েক দশক ধরে উন্নত অর্থনীতিগুলো প্রযুক্তি, পুঁজি ও বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একটি বিশেষ অবস্থান ধরে রেখেছিল। কিন্তু প্রযুক্তির বিস্তার এবং নতুন শিল্পশক্তির উত্থান সেই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে।
এই কারণেই পশ্চিমা বিশ্বের কিছু অংশে ‘চায়না শক ২.০’ নিয়ে আলোচনা দেখা যায়। তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু মূলত চীনের দ্রুত অগ্রগতি নয়; বরং এই অগ্রগতির ফলে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সুবিধার পুনর্বণ্টন। যখন উন্নত প্রযুক্তি আরও বেশি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের নাগালে পৌঁছে যায়, তখন পুরোনো একচেটিয়া সুবিধাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়, যা সবাই সমানভাবে স্বাগত জানায় না।
অবশ্য এই বিতর্কের একটি বৃহত্তর দিকও রয়েছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান সমস্যা প্রযুক্তির অতিরিক্ত বিস্তার নয়, বরং সহযোগিতার ঘাটতি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থায় কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। এই বাস্তবতায় চীনের অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক মডেল অনেক দেশের কাছে একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
অতএব, ‘চায়না অপারচুনিটি ২.০’কে শুধু চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যের নতুন নাম হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে এমন একটি ধারণা, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করে: বিশ্বায়ন কি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, নাকি ক্রমবর্ধমান বিভাজনের শিকার হবে? প্রযুক্তি কি সীমিত কয়েকটি দেশের হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকবে, নাকি আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়বে? এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কি প্রতিযোগিতার চাপে সংকুচিত হবে, নাকি নতুন রূপে পুনর্গঠিত হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও নির্ধারিত নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, চীনের উত্থানকে কেবল একটি জাতীয় ঘটনা হিসেবে দেখা আর সম্ভব নয়। এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ। আর সেই কারণেই চীনকে সুযোগ হিসেবে দেখা হোক বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে, তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ বিশ্বের আর নেই।
গ্লোবাল টাইমস সম্পাদকীয় 



















