প্রায় আড়াই শতাব্দী পর সংগীতপ্রেমীদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে এক অসাধারণ আবিষ্কার। ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে পাওয়া একটি পুরোনো নোটবই থেকে উঠে এসেছে বিশ্বখ্যাত সুরকার ভলফগ্যাং আমাদেউস মোজার্টের শিক্ষাদান পদ্ধতির বিরল চিত্র। একই সঙ্গে মিলেছে বাঁশি ও হার্পের জন্য রচিত সাতটি অজানা সংগীতকর্ম, যা বিশেষজ্ঞদের মতে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে মোজার্ট-সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি।
শিক্ষার্থীকে শেখাতে গিয়ে সৃষ্টি
১৭৭৮ সালে প্যারিসে মোজার্ট এক তরুণী শিক্ষার্থীকে সংগীত রচনার পাঠ দিতেন। তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা এবং দক্ষ হার্পবাদক। একটি পাঠের সময় শিক্ষার্থীকে একটি সুর তৈরি করতে বলা হলে তিনি দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও এগোতে পারছিলেন না। তখন মোজার্ট নিজেই একটি সুরের শুরু লিখে দেন এবং বাকি অংশ শেষ করতে বলেন।
সেই সময়ের চিঠিপত্রে মোজার্ট শিক্ষার্থীর মেধার প্রশংসা করলেও নতুন সুর তৈরিতে তার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তবে সেই শিক্ষণ প্রক্রিয়াই আজ ইতিহাসের মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠেছে।
৪৪ পৃষ্ঠার নোটবইয়ে লুকিয়ে ছিল বিস্ময়
সম্প্রতি আবিষ্কৃত ৪৪ পৃষ্ঠার নোটবইটিতে শিক্ষার্থীর সংগীতচর্চা, অনুশীলন এবং তার ওপর মোজার্টের সংশোধন ও পরামর্শ সংরক্ষিত রয়েছে। গবেষকদের মতে, এতে স্পষ্টভাবে দেখা যায় কীভাবে তিনি শিক্ষার্থীর লেখা অংশগুলো উন্নত করতেন এবং কোথায় নিজের সৃজনশীলতা যোগ করতেন।
নোটবইটি প্রথম নজরে আসে এক গবেষকের কাছে, যিনি অবসরের আগে কিছু অজ্ঞাত পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা করছিলেন। পরে লেখার ধরন ও সংগীতলিপির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে শিক্ষক হিসেবে যাঁর হাতের লেখা রয়েছে, তা মোজার্টেরই।

সাতটি নতুন সংগীতকর্ম
নোটবই থেকে উদ্ধার হওয়া সাতটি সংগীতকর্মের বেশিরভাগই ছোট আকারের এবং তুলনামূলকভাবে হালকা ধাঁচের। তবে এর মধ্যে একটি দ্রুতগতির অংশ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। গবেষকদের ধারণা, ওই রচনার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই মোজার্ট নিজে লিখেছিলেন বা ব্যাপকভাবে সংশোধন করেছিলেন।
সম্প্রতি ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এসব সংগীত পরিবেশিত হয়। পরিবেশনার পর সংগীতশিল্পী ও গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, এই নতুন সংগীতকর্ম ভবিষ্যতে বাঁশি ও হার্পের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশনাযোগ্য রচনার তালিকায় স্থান করে নেবে।
মোজার্টের শিক্ষাদানের বিরল চিত্র
আবিষ্কৃত নোটবইয়ের আরেকটি বড় গুরুত্ব হলো, এটি মোজার্টের শিক্ষাদানের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেয়। প্রতিটি সুরের অংশে শিক্ষার্থীর লেখা এবং তার ওপর মোজার্টের সংশোধন তুলনা করে দেখা সম্ভব হচ্ছে। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে তিনি কীভাবে একজন শিক্ষার্থীকে ধাপে ধাপে সংগীত রচনার দক্ষতা শেখাতেন।
গবেষকদের মতে, যদি শিক্ষার্থী আরও দক্ষ হতেন, তাহলে হয়তো মোজার্টকে এত বেশি সংশোধন করতে হতো না। কিন্তু ঠিক এই কারণেই নোটবইটি আজ এত মূল্যবান হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের যৌথ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছিল এমন কিছু সুর, যা এখনও শ্রোতাদের মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখে।
সংগীতবিশারদদের বিশ্বাস, এই আবিষ্কার শুধু মোজার্ট গবেষণাকেই নতুন মাত্রা দেবে না, বরং আঠারো শতকের সংগীত শিক্ষা ও সৃজনপ্রক্রিয়া সম্পর্কেও নতুন আলো ফেলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















