০৯:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
তুরস্ককে ৭০ কোটি ডলারের জেট ইঞ্জিন বিক্রিতে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র দুর্যোগের দিনে টিকে থাকার পাঠ: কেন বাড়ছে জরুরি প্রস্তুতির গুরুত্ব বিশ্বকাপের বল নিয়ে গোলরক্ষকদের দুশ্চিন্তা, প্রশ্নের উত্তর দিলেন জো হার্ট ২০৩৮ বিশ্বকাপ আয়োজনেও আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র, জানালেন ট্রাম্পের উপদেষ্টা সিয়াটলে ইরান-মিসর ম্যাচ ঘিরে বিতর্ক, রংধনু পতাকা নিয়ে ফিফার সিদ্ধান্তে উত্তেজনা মোজার্টের অজানা সুরের খাতা আবিষ্কার, মিলল সাতটি নতুন সংগীতকর্ম ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাই না টেনেসি উইলিয়ামসের নাটক থেকে অপেরা: পাখি, অন্ধকার রহস্য আর গথিক আবহে নতুন রূপ ইউরোপে রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া ‘প্রায় অসম্ভব’ বলছেন বিজ্ঞানীরা হরমুজ প্রণালির বিকল্প খুঁজছে বিশ্ব, তেল সরবরাহে নতুন কৌশলে কমছে ঝুঁকি

একটি স্মৃতি, একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত: আশুরার চিরন্তন শিক্ষা

কারবালার ঘটনার পর কেটে গেছে তেরো শতাব্দীরও বেশি সময়। কিন্তু ইতিহাসের অগণিত ঘটনার ভিড়ে এই এক অধ্যায় আজও মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। কারণ কারবালা কেবল একটি শোকগাথা নয়; এটি মানুষের সামনে দাঁড়ানো এক মৌলিক নৈতিক প্রশ্নের প্রতীক। সেই প্রশ্ন হলো—ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করা হবে, নাকি ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য চুকানো হবে?

আশুরার তাৎপর্য এখানেই। এটি এমন এক সিদ্ধান্তের স্মরণ, যেখানে ইমাম হুসাইন (রা.) নিরাপত্তা, সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার পথ বেছে নেননি। তিনি এমন এক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, যা ব্যক্তিগতভাবে ছিল বিপজ্জনক, কিন্তু নৈতিকভাবে ছিল অপরিহার্য। তাই কারবালার বার্তা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানব মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং বিবেকের স্বাধীনতার এক সর্বজনীন প্রতীক।

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, রাষ্ট্র ও ক্ষমতা মানুষের আনুগত্য আদায় করতে পারে, কিন্তু নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে না শুধুমাত্র শক্তির জোরে। অস্ত্র প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে পারে, কিন্তু কোনো আদর্শকে মুছে দিতে পারে না। সাময়িক বিজয় অনেক সময় শক্তিধরদের হাতে যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্মৃতিতে টিকে থাকে নৈতিক অবস্থান। কারবালার শিক্ষা এই বাস্তবতাকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব অগ্রগতির যুগে আমরা বাস করছি। তবু মানবসমাজের সামনে থাকা মৌলিক নৈতিক সংকটগুলো খুব বেশি বদলায়নি। এখনো পৃথিবীর নানা প্রান্তে দখলদারিত্ব, আগ্রাসন, বৈষম্য ও অন্যায়ের ঘটনা ঘটে চলেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রায়ই ন্যায়বিচারের চেয়ে শক্তির হিসাব বেশি গুরুত্ব পায়। এই বাস্তবতায় আশুরার শিক্ষা নতুন অর্থে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

প্রতিরোধের ধারণাকে প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। অনেকেই এটিকে সংঘাত বা যুদ্ধের সমার্থক মনে করেন। অথচ কারবালার শিক্ষা ভিন্ন কিছু বলে। প্রতিরোধের অর্থ অকারণ সংঘর্ষ নয়; বরং এমন পরিস্থিতিতে নৈতিক দৃঢ়তা বজায় রাখা, যখন চারপাশের চাপ মানুষকে আপস করতে বাধ্য করে। এটি মূলত একটি নৈতিক অবস্থান, যার রাজনৈতিক প্রতিফলন থাকতে পারে, কিন্তু যার ভিত্তি ন্যায় ও মর্যাদার প্রশ্নে অটল থাকা।

একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা কেবল সামরিক শক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক সম্পর্ক, পারস্পরিক সম্মান এবং সমতার স্বীকৃতি। যে শান্তি ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা স্থায়ী হয় না। টেকসই শান্তি গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ ও রাষ্ট্র উভয়ই ন্যায়বিচারকে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে।

ভারতীয় উপমহাদেশে মুহররমের স্মরণচর্চা দীর্ঘদিন ধরেই এক অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সামাজিক পটভূমির মানুষ কারবালার কাহিনিতে সাহস, আত্মত্যাগ এবং নৈতিক দৃঢ়তার প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছেন। এ কারণেই ইমাম হুসাইন (রা.)-এর স্মৃতি বহু মানুষের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করে এক মানবিক আদর্শে পরিণত হয়েছে।

মহাত্মা গান্ধীও কারবালার শিক্ষা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন বলে বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে নৈতিক সাহসের শক্তি প্রায়ই সহিংসতার শক্তিকে অতিক্রম করে যায়। যদিও তাদের সময় ও প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন, তবু সত্যের প্রতি অটল থাকা এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার ক্ষেত্রে দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি গভীর মিল দেখা যায়।

প্রতিটি যুগেই অত্যাচার নতুন রূপে ফিরে আসে। একইভাবে মানুষের বিবেকও নতুন নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। সময় বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকে যায় অপরিবর্তিত—অন্যায়কে মেনে নেওয়া হবে, নাকি নীতির পক্ষে দাঁড়ানো হবে? আশুরা প্রতি বছর সেই প্রশ্নটিই আবার আমাদের সামনে তুলে ধরে।

এ কারণেই কারবালার স্মৃতি কেবল অতীতের কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। এটি মানুষের নৈতিক স্বাধীনতা, সত্যের প্রতি অঙ্গীকার এবং মর্যাদার জন্য সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতীক, যা যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বজুড়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তুরস্ককে ৭০ কোটি ডলারের জেট ইঞ্জিন বিক্রিতে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

একটি স্মৃতি, একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত: আশুরার চিরন্তন শিক্ষা

০৭:৪৬:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

কারবালার ঘটনার পর কেটে গেছে তেরো শতাব্দীরও বেশি সময়। কিন্তু ইতিহাসের অগণিত ঘটনার ভিড়ে এই এক অধ্যায় আজও মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। কারণ কারবালা কেবল একটি শোকগাথা নয়; এটি মানুষের সামনে দাঁড়ানো এক মৌলিক নৈতিক প্রশ্নের প্রতীক। সেই প্রশ্ন হলো—ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করা হবে, নাকি ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য চুকানো হবে?

আশুরার তাৎপর্য এখানেই। এটি এমন এক সিদ্ধান্তের স্মরণ, যেখানে ইমাম হুসাইন (রা.) নিরাপত্তা, সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার পথ বেছে নেননি। তিনি এমন এক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, যা ব্যক্তিগতভাবে ছিল বিপজ্জনক, কিন্তু নৈতিকভাবে ছিল অপরিহার্য। তাই কারবালার বার্তা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানব মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং বিবেকের স্বাধীনতার এক সর্বজনীন প্রতীক।

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, রাষ্ট্র ও ক্ষমতা মানুষের আনুগত্য আদায় করতে পারে, কিন্তু নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে না শুধুমাত্র শক্তির জোরে। অস্ত্র প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে পারে, কিন্তু কোনো আদর্শকে মুছে দিতে পারে না। সাময়িক বিজয় অনেক সময় শক্তিধরদের হাতে যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্মৃতিতে টিকে থাকে নৈতিক অবস্থান। কারবালার শিক্ষা এই বাস্তবতাকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব অগ্রগতির যুগে আমরা বাস করছি। তবু মানবসমাজের সামনে থাকা মৌলিক নৈতিক সংকটগুলো খুব বেশি বদলায়নি। এখনো পৃথিবীর নানা প্রান্তে দখলদারিত্ব, আগ্রাসন, বৈষম্য ও অন্যায়ের ঘটনা ঘটে চলেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রায়ই ন্যায়বিচারের চেয়ে শক্তির হিসাব বেশি গুরুত্ব পায়। এই বাস্তবতায় আশুরার শিক্ষা নতুন অর্থে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

প্রতিরোধের ধারণাকে প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। অনেকেই এটিকে সংঘাত বা যুদ্ধের সমার্থক মনে করেন। অথচ কারবালার শিক্ষা ভিন্ন কিছু বলে। প্রতিরোধের অর্থ অকারণ সংঘর্ষ নয়; বরং এমন পরিস্থিতিতে নৈতিক দৃঢ়তা বজায় রাখা, যখন চারপাশের চাপ মানুষকে আপস করতে বাধ্য করে। এটি মূলত একটি নৈতিক অবস্থান, যার রাজনৈতিক প্রতিফলন থাকতে পারে, কিন্তু যার ভিত্তি ন্যায় ও মর্যাদার প্রশ্নে অটল থাকা।

একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা কেবল সামরিক শক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক সম্পর্ক, পারস্পরিক সম্মান এবং সমতার স্বীকৃতি। যে শান্তি ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা স্থায়ী হয় না। টেকসই শান্তি গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ ও রাষ্ট্র উভয়ই ন্যায়বিচারকে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে।

ভারতীয় উপমহাদেশে মুহররমের স্মরণচর্চা দীর্ঘদিন ধরেই এক অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সামাজিক পটভূমির মানুষ কারবালার কাহিনিতে সাহস, আত্মত্যাগ এবং নৈতিক দৃঢ়তার প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছেন। এ কারণেই ইমাম হুসাইন (রা.)-এর স্মৃতি বহু মানুষের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করে এক মানবিক আদর্শে পরিণত হয়েছে।

মহাত্মা গান্ধীও কারবালার শিক্ষা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন বলে বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে নৈতিক সাহসের শক্তি প্রায়ই সহিংসতার শক্তিকে অতিক্রম করে যায়। যদিও তাদের সময় ও প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন, তবু সত্যের প্রতি অটল থাকা এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার ক্ষেত্রে দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি গভীর মিল দেখা যায়।

প্রতিটি যুগেই অত্যাচার নতুন রূপে ফিরে আসে। একইভাবে মানুষের বিবেকও নতুন নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। সময় বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকে যায় অপরিবর্তিত—অন্যায়কে মেনে নেওয়া হবে, নাকি নীতির পক্ষে দাঁড়ানো হবে? আশুরা প্রতি বছর সেই প্রশ্নটিই আবার আমাদের সামনে তুলে ধরে।

এ কারণেই কারবালার স্মৃতি কেবল অতীতের কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। এটি মানুষের নৈতিক স্বাধীনতা, সত্যের প্রতি অঙ্গীকার এবং মর্যাদার জন্য সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতীক, যা যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বজুড়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে।