যুদ্ধ শেষ হলে সাধারণত একটি প্রশ্নই সামনে আসে—কে জিতল? কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যুদ্ধের প্রকৃত মূল্যায়ন বিজয়ী নির্ধারণের মাধ্যমে হয় না; হয় এই বিচার দিয়ে যে সংঘাতের পর কে রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল।
সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত এই পুরোনো সত্যটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য এবং কৌশলগত সাফল্য সবসময় এক নয়। সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করা, শীর্ষ কমান্ডারদের হত্যা করা কিংবা প্রতিপক্ষের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন। কিন্তু এগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা রাজনৈতিক ফল এনে দেয়, সেটিই আসল প্রশ্ন।
ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সামরিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়েছে দেশটি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাও ধাক্কা খেয়েছে। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো স্পষ্ট সাফল্য। কিন্তু যুদ্ধের উদ্দেশ্য যদি কেবল ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো না হয়ে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক আচরণ পরিবর্তন করা হয়, তাহলে মূল্যায়নের মানদণ্ডও ভিন্ন হতে হবে।
ইতিহাসের একটি বড় ভুল ধারণা হলো—কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো ভেতরে ভেতরে এতটাই দুর্বল যে নেতৃত্বের ওপর আঘাত হানলেই পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। বাস্তবতা অনেক জটিল। বহু বছর ধরে ইরান সম্ভাব্য হামলা, নেতৃত্ব হারানো কিংবা বড় ধরনের সামরিক বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামো, নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক এবং বিকল্প সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার ফলে শীর্ষ পর্যায়ে ক্ষতি হলেও রাষ্ট্রযন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়েনি।
এই অভিজ্ঞতা শুধু ইরানের ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে, যেখানে নেতৃত্ব বিচ্ছিন্ন হলেও শাসনব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে। ফলে নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু বানানো মানেই শাসনব্যবস্থার পতন—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় মেলে না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে বাইরের চাপ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা সামরিক চাপ প্রায়ই শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল না করে বরং আরও সংহত করেছে। রাষ্ট্রের ভেতরে ‘অবরুদ্ধ দুর্গ’ মানসিকতা তৈরি হলে শাসকরা নিজেদের অস্তিত্বকেই জাতীয় প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়।

ইরানের ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটতে পারে। দেশটির নেতৃত্ব এখন দাবি করতে পারবে যে তারা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিগুলোর চাপ মোকাবিলা করে টিকে আছে। সাধারণ মানুষ সেই বক্তব্য কতটা গ্রহণ করবে, তা আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু ক্ষমতাসীন কাঠামোর জন্য টিকে থাকাটাই একটি রাজনৈতিক বিজয়ে পরিণত হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংঘাত ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন আনতে পারে। ধর্মীয় নেতৃত্বকেন্দ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অনেক সময় রাষ্ট্রকে আরও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক করে তোলে এবং রাজনৈতিক নমনীয়তার পরিবর্তে কঠোর অবস্থানকে উৎসাহিত করে।
অনেকে বিশ্বাস করেন, অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক চাপ শেষ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রকে আপসের পথে নিয়ে আসে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী যদি মনে করে যে তাদের বর্তমান নীতিই টিকে থাকার মূল কারণ, তাহলে তারা উল্টো আরও অনমনীয় হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে কূটনীতি পুনর্মিলনের পথ না হয়ে প্রতিযোগিতার আরেকটি ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।
এই বাস্তবতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ভাবনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে যে অর্থনৈতিক চাপ, তথ্যযুদ্ধ বা সীমিত সামরিক হামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটায় না। দীর্ঘদিনের আদর্শিক রাষ্ট্রগুলো সাধারণত বেঁচে থাকার জন্য নানা স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে এবং বাইরের প্রতিটি সংকট থেকে নতুন শিক্ষা গ্রহণ করে।
ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভ করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কিন্তু সেই জয়কে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফলে রূপ দেওয়া অনেক কঠিন। একটি রাষ্ট্র সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও রাজনৈতিকভাবে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠতে পারে। আর যখন এমনটি ঘটে, তখন যুদ্ধ শেষ হলেও সংঘাতের মূল কারণ অমীমাংসিত থেকে যায়।
সুতরাং এই সংঘাতের মূল্যায়ন শুধু ধ্বংস হওয়া স্থাপনা কিংবা নিহত কমান্ডারদের সংখ্যা দিয়ে করা যাবে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ কি প্রতিপক্ষকে তার রাজনৈতিক পথ বদলাতে বাধ্য করেছে? যদি উত্তর না হয়, তাহলে সামরিক সাফল্য যতই চমকপ্রদ হোক, কৌশলগত বিজয় এখনও অধরাই থেকে যায়।
চুন ইন-বুম 



















