দীর্ঘদিনের সংঘাত কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ইসরায়েল, লেবানন এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছে। কয়েক দিনের আলোচনার পর স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে। তবে হিজবুল্লাহ এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ
চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি একটি দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। সামনে আরও অনেক কাজ বাকি থাকলেও সংঘাত নিরসনের জন্য এই পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি ত্রিপক্ষীয় সামরিক সমন্বয় কাঠামো গঠন করা হবে। একই সঙ্গে লেবাননে মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে দেশটি নিজ ভূখণ্ডে কার্যকরভাবে সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

নতুন অধ্যায়ের আশা
ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা এই সমঝোতাকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে উত্তেজনা কমবে এবং উভয় দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী হবে।
তারা দাবি করেছেন, এই চুক্তির ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাইরের প্রভাব কমবে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ আরও প্রশস্ত হবে।
লেবাননের নেতৃত্বের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন চুক্তিটিকে দেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে প্রথম ধাপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজেদের এলাকায় ফিরে যেতে পারবেন এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামও দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, এতে সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পথ খুলে যাবে এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম গতি পাবে।
হিজবুল্লাহর কড়া আপত্তি
চুক্তির সবচেয়ে বড় বিরোধী অবস্থানে রয়েছে হিজবুল্লাহ। দলটির নেতারা মনে করছেন, এই সমঝোতা বাস্তবায়নের চেষ্টা দেশকে নতুন অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
হিজবুল্লাহর দাবি, তাদের মতামত ও ভূমিকা উপেক্ষা করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব হবে না। তারা সরাসরি ইসরায়েল-লেবানন আলোচনার বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং এই চুক্তিকে আঞ্চলিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
ইসরায়েলের শর্ত
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চুক্তিকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, হিজবুল্লাহ পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি দূর না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উপস্থিতি বজায় থাকবে।

তিনি আরও জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় ধাপে ধাপে লেবাননের সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের প্রস্তুতি নিতে দেওয়া হবে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কিছু বাস্তুচ্যুত বাসিন্দার নিজ এলাকায় ফেরার সুযোগ সীমিত থাকতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমঝোতা সফল হলে ইসরায়েল-লেবানন সম্পর্কের পাশাপাশি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে হিজবুল্লাহর আপত্তি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে। ফলে শান্তির এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















