বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কারণে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প নতুন করে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আরও অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে লাখো শ্রমিকের জীবিকায়।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এই খাত। চার মিলিয়নেরও বেশি মানুষ, যাদের অধিকাংশই নারী, সরাসরি পোশাক শিল্পে কাজ করেন। এছাড়া কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার পর থেকেই চাপ
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিভিন্ন সময়ে কারখানা বন্ধ থাকা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা অনেক বিদেশি ক্রেতাকে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে।

গত কয়েক বছরে শত শত পোশাক কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এর ফলে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়েছে।
লোডশেডিংয়ে কমছে উৎপাদন
রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে জেনারেটর ব্যবহারে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে উল্লেখযোগ্যভাবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া বারবার থেমে যাওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, কয়েক মাসের ব্যবধানে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
কমছে বিদেশি ক্রয়াদেশ
উৎপাদনে বিলম্ব, পরিবহন জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে অনেক বৈশ্বিক ক্রেতা অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে। কারখানা মালিকদের অনেকে বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের নতুন ক্রয়াদেশ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

রপ্তানি আয়েও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। টানা কয়েক মাস ধরে পোশাক রপ্তানি নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে, যা শিল্প মালিকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিতে নতুন সংকট
তেল ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পোশাক তৈরির বিভিন্ন উপকরণের খরচও দ্রুত বাড়ছে। সিনথেটিক ফাইবার, রং, রাসায়নিক, প্লাস্টিক বোতাম, চেইনসহ বিভিন্ন কাঁচামালের উৎপাদন জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে।
বিশেষ করে পলিয়েস্টারভিত্তিক পণ্যের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চাকরি হারানোর আশঙ্কা
![]()
শিল্প খাতকে সহায়তা দিতে সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও অনেক উদ্যোক্তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণের সুদ ও অন্যান্য ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এরই মধ্যে বহু শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে নতুন করে ছাঁটাই এবং শ্রম অসন্তোষের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় সংক্রান্ত সংকট দ্রুত সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তা ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















