ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চল ধীরে ধীরে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে নিস শহরে জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী জোটের বিজয় শুধু একটি নগর প্রশাসনের পরিবর্তন নয়, বরং আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
দেশটির পঞ্চম বৃহত্তম শহর নিস দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপন্থী নেতৃত্বের অধীনে ছিল। তবে এবারের নির্বাচনে ভোটাররা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। নতুন মেয়র এরিক সিওত্তি নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি ব্যয় কমানো এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন।
নিরাপত্তা ইস্যুতে ভোটারদের ঝোঁক
নিসের সমুদ্রতীরবর্তী বিলাসবহুল এলাকার বাইরে শহরের কিছু অংশে অপরাধ ও মাদক চক্রের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘবদ্ধ অপরাধের কারণে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিকে সামনে এনে কঠোর আইন-শৃঙ্খলা নীতির প্রতিশ্রুতি দেন সিওত্তি।

তার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় নিরাপত্তা উপস্থিতি জোরদার করা। এই বার্তা বিশেষ করে প্রবীণ ও রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
নতুন নির্বাচনী কৌশল
জাতীয়তাবাদী ডানপন্থীরা এখন শুধু শ্রমজীবী ভোটারদের ওপর নির্ভর করছে না। তারা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত রক্ষণশীল ভোটারদেরও নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে। কর কমানো, সরকারি অপচয় হ্রাস এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির মতো অর্থনৈতিক বার্তার সঙ্গে জাতীয় পরিচয় ও অভিবাসনবিরোধী অবস্থানকে একসঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে।
এই কৌশল দক্ষিণ ফ্রান্সের বহু শহরে কার্যকর হয়েছে। নিস ছাড়াও অঞ্চলটির বেশ কয়েকটি শহর ইতোমধ্যে জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
পরিচয় রাজনীতি ও স্থানীয় সংস্কৃতি
দক্ষিণাঞ্চলের অনেক শহরে স্থানীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিছু পৌরসভা ইউরোপীয় প্রতীক ব্যবহারে অনাগ্রহ দেখিয়েছে এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
সমর্থকদের দাবি, এসব শহরে পরিচ্ছন্নতা বেড়েছে, স্থানীয় অনুষ্ঠান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনসেবার মান উন্নত হয়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ডানপন্থী প্রশাসনের প্রতি সমর্থন আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
বিতর্কও কম নয়
তবে এই রাজনৈতিক উত্থান বিতর্কমুক্ত নয়। মানবাধিকার, অভিবাসী সহায়তা এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর জন্য বরাদ্দ কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। কিছু শহরে প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ সমাজে বিভাজন বাড়াতে পারে। অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, এগুলো স্থানীয় জনগণের চাহিদার প্রতিফলন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বড় পরীক্ষা
আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দক্ষিণ ফ্রান্স এখন কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। এখানকার শহরগুলোতে প্রশাসনিক সাফল্য বা ব্যর্থতা জাতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এসব শহরের প্রশাসন কার্যকর প্রমাণিত হয়, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে ডানপন্থীদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তে পারে। আবার বিতর্ক ও ব্যর্থতা দেখা দিলে সেটি তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। ফলে দক্ষিণ ফ্রান্সের এই রাজনৈতিক পরিবর্তন এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, পুরো দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















