বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতাকে সামনে এনে ইউরোপের নেতারা ক্রমেই নিজেদের অর্থনৈতিক সমস্যার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের বক্তব্য, কিছু দেশ অত্যধিক উৎপাদন করছে কিন্তু পর্যাপ্ত ভোগ করছে না, আবার অন্য কিছু দেশ তার উল্টো অবস্থায় রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, ইউরোপের শিল্পখাতের বর্তমান সংকটের পেছনে শুধু বাইরের কারণ নয়, নিজেদের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখছে।
ইউরোপের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীন। দেশটির শক্তিশালী উৎপাদনশিল্প বিশ্ববাজারে ইউরোপীয় অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে। এর প্রভাব হিসেবে ইউরোপে ধীরে ধীরে শিল্পখাতের গুরুত্ব কমছে। বিশেষ করে গাড়ি শিল্পসহ কিছু ঐতিহ্যবাহী খাতে কর্মসংস্থান ও বাজার অংশীদারিত্বের চাপ রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা যে নেই, তা নয়। চীনের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি এবং তুলনামূলক কম অভ্যন্তরীণ ভোগের কারণে দেশটি বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল সরকারি ঋণ ও ব্যয়ের মাধ্যমে সেই উদ্বৃত্তের বড় অংশ শোষণ করছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি অসম ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।
তবে ইউরোপ নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হিসেবে তুলে ধরলেও পরিসংখ্যান ভিন্ন চিত্র দেখায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেও বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে। জার্মানির মতো দেশগুলোর উদ্বৃত্ত আরও বেশি। অর্থাৎ ইউরোপ আমদানি-নির্ভর ঘাটতির অর্থনীতি নয়।

প্রতিযোগিতা হারানোর আসল কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের সমস্যার বড় অংশ এসেছে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে। চীনা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা অবশ্যই একটি কারণ, কিন্তু সেটিই পুরো ব্যাখ্যা নয়। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, শ্রমবাজারের জটিলতা, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিও শিল্পখাতকে দুর্বল করেছে।
অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান হারাচ্ছে কারণ তারা আগের মতো দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক থাকতে পারেনি। ফলে শুধু বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বীদের দোষারোপ করলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যায়।
বাণিজ্য বাধা কি সমাধান?
ইউরোপের কিছু মহলে চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক ও বাণিজ্যিক বাধা আরোপের দাবি উঠছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সমাধান নয়। কারণ সস্তা ও দক্ষ সরবরাহকারীদের থেকে দূরে সরে গেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

একই সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা বাড়লে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। ফলে ভোক্তারা বেশি দাম দিতে বাধ্য হতে পারেন এবং শিল্পখাতের সংস্কারের চাপও কমে যেতে পারে।
সংস্কারই হতে পারে টেকসই পথ
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজেদের অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা। জ্বালানি ব্যয় কমানো, শ্রমবাজারকে আরও নমনীয় করা, পুঁজি ও সেবা বাজারের সমন্বয় বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় নিয়মকানুন সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরলে তা অবশ্যই ইতিবাচক হবে। কিন্তু ইউরোপের শিল্পখাতকে শক্তিশালী করার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো দূর করা। প্রতিযোগীদের ঠেকানোর চেয়ে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদে বেশি ফলদায়ক হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















