০৫:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
নতুন বিপর্যয়ে থমকে গেল ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, ভূমিকম্পের ধাক্কায় পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা অনিশ্চিত বিশ্বব্যাংকের ১.১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা: খাদ্য নিরাপত্তা ও জরুরি সুরক্ষায় নতুন ভরসা বাংলাদেশের নতুন ৭ শিশুর মৃত্যু, হামে মৃতের সংখ্যা ৭০৯ ছাড়াল নিখোঁজের পর কুষ্টিয়ায় নদী থেকে উদ্ধার প্রতিবন্ধী যুবকের মরদেহ গাজীপুরে ডেঙ্গুতে ৯ বছরের শিশুর মৃত্যু সিরাজগঞ্জে তীব্র লোডশেডিংয়ে ক্ষোভ: পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও, বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন গ্রামবাসী নিষ্প্রভ উদারনীতির সংকট: কেন কেন্দ্রপন্থাকে আবার বিদ্রোহী হতে হবে বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের গোলঝড়, নিউ জিল্যান্ডকে উড়িয়ে নকআউটে শীর্ষে রেড ডেভিলস নতুন বাস্তবতায় উপসাগর: যুদ্ধের ধাক্কায় বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ও রাজনীতি এবার লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থার ঝড়, বদলে যাচ্ছে রাজনীতির মানচিত্র

নামমাত্র স্থিতিশীলতা নয়, এখন প্রয়োজন প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়

অর্থনীতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন সংকট সামাল দেওয়াই সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে হয়। কিন্তু সেই সাফল্যই পরবর্তী চ্যালেঞ্জের সূচনা করে। পাকিস্তানের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সন্ধিক্ষণে উপস্থাপিত হয়েছে, যখন দেশটি দীর্ঘ অস্থিরতার পর তুলনামূলক স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ, মুদ্রার অনিশ্চয়তা এবং কঠোর আর্থিক সমন্বয়ের বছরগুলো পেরিয়ে অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, স্থিতিশীলতা অর্জনের পর পরবর্তী গন্তব্য কী?

এবারের বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সংযত চরিত্র। সরকার ব্যয়ের লাগাম ছেড়ে দিয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথ বেছে নেয়নি। বরং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে সীমিত পরিসরে কিছু খাতকে উৎসাহ দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো অনেকের প্রত্যাশা পূরণ করবে না, কিন্তু বাস্তবতা হলো রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা এখনো সংকুচিত। ফলে নীতিনির্ধারকদের জন্য সাহসী প্রতিশ্রুতির চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।

বাজেটে আর্থিক ঘাটতি ও প্রাইমারি উদ্বৃত্তের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা মূলত বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে একটি বার্তা বহন করে—পাকিস্তান অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার পথে থাকতে চায়। অর্থনীতির ভাষায় এটি হয়তো আকর্ষণীয় শোনায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে ওঠে এমন সিদ্ধান্তের ওপরই।

একই সঙ্গে কিছু খাতে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা লক্ষণীয়। চাকরিজীবীদের জন্য কর কাঠামোয় পরিবর্তন, নির্দিষ্ট করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ কমানো এবং আবাসন খাতে কিছু কর হ্রাস ব্যবসা ও ভোক্তা—উভয় পক্ষের জন্য ইতিবাচক সংকেত। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে মন্থর থাকা সম্পত্তি খাতে এই পদক্ষেপ লেনদেন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। কারণ আবাসন খাতের সঙ্গে বহু শিল্প ও সেবাখাত প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

মূল্যস্ফীতি হ্রাস নয় আরও স্ফীত হচ্ছে

ডিজিটাল অর্থনীতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানির ওপর গুরুত্ব আরেকটি ইতিবাচক দিক। বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় শুধুমাত্র ঐতিহ্যগত খাতের ওপর নির্ভর করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি সম্ভব নয়। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, সফটওয়্যার এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্প আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে। বাজেটে এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়।

অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের দুর্বল অংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। বাজারের ধাক্কা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।

তবে ইতিবাচক দিকগুলোর মাঝেও বড় কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই বাজেট কি প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে সক্ষম? সংকট মোকাবিলার পর্যায় থেকে বেরিয়ে আসার পর ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা করছেন। তারা এমন নীতির খোঁজ করছেন, যা উৎপাদন বাড়াবে, রপ্তানিকে বহুমুখী করবে, নতুন শিল্প গড়ে তুলবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

বাস্তবে বাজেটে কিছু প্রণোদনা থাকলেও একটি সুসংহত শিল্পায়ন কৌশল স্পষ্টভাবে অনুপস্থিত। উৎপাদনশীল খাতে বড় বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ, আমদানি নির্ভরতা কমানো কিংবা নতুন রপ্তানি সক্ষমতা তৈরির মতো বিষয়গুলো আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হতে পারত। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেটি নিজে থেকে প্রবৃদ্ধি তৈরি করে না।

রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রের আয় বাড়ানো জরুরি, কিন্তু সেই আয় কীভাবে আসবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরেই আনুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করে আসছেন যে করের বড় বোঝা তাদের কাঁধেই পড়ে, অথচ অর্থনীতির বড় অংশ এখনো করের আওতার বাইরে। তাই রাজস্ব বৃদ্ধি যদি শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে অর্জিত হয়, তাহলে তা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও দুর্বল করতে পারে। প্রয়োজন করের ভিত্তি বিস্তৃত করা এবং নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে আনা।

বাজেটের আরেকটি সীমাবদ্ধতা রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কাঠামোতেই নিহিত। সরকারের বড় অংশের ব্যয় নির্ধারিত বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ থাকায় উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। ফলে অবকাঠামো, জ্বালানি, পানি ব্যবস্থাপনা বা ডিজিটাল রূপান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ থাকলেও তার পরিসর প্রয়োজনের তুলনায় ছোট থেকে যাচ্ছে।

Budget 2026-2027: Guide to Key Economic Terms

এখানেই বৃহত্তর বাস্তবতা সামনে আসে। কোনো দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কেবল বার্ষিক বাজেটের ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নয়ন, নীতির ধারাবাহিকতা, সাশ্রয়ী জ্বালানি, সহজতর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ—এসবই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির আসল ভিত্তি। কর ছাড় বা কর বৃদ্ধি সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশ বিবেচনা করেই।

সুতরাং এই বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ঘোষণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিশ্রুত সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবে রূপ নেয়। নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসা পরিবেশ তৈরি না হলে বাজেটের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোরও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

বর্তমান বাজেটকে তাই সংকট-পরবর্তী পুনর্গঠনের একটি ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি অর্জিত স্থিতিশীলতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে এবং নির্বাচিত কিছু খাতে সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির যাত্রাপথ এখানেই শেষ নয়। আগামী অধ্যায় হতে হবে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, উদ্ভাবন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অধ্যায়।

সামগ্রিক বিচারে এই বাজেটকে একপাক্ষিকভাবে সফল বা ব্যর্থ বলা কঠিন। এটি বাস্তবতার সীমার মধ্যে তৈরি একটি নীতিপত্র, যা স্থিতিশীলতার গুরুত্ব স্বীকার করে এবং কিছু প্রয়োজনীয় স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের আরও বড় প্রশ্ন সামনে রেখে যায়—পাকিস্তান কীভাবে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি ও বিস্তৃত সমৃদ্ধির পথে এগোবে?

স্থিতিশীলতা অবশ্যই একটি অর্জন। কিন্তু একটি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি হয়ে ফিরে আসে। এখন পাকিস্তানের সামনে সেই কঠিন কিন্তু অপরিহার্য পথচলাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন বিপর্যয়ে থমকে গেল ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, ভূমিকম্পের ধাক্কায় পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা অনিশ্চিত

নামমাত্র স্থিতিশীলতা নয়, এখন প্রয়োজন প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়

০৪:১১:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

অর্থনীতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন সংকট সামাল দেওয়াই সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে হয়। কিন্তু সেই সাফল্যই পরবর্তী চ্যালেঞ্জের সূচনা করে। পাকিস্তানের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সন্ধিক্ষণে উপস্থাপিত হয়েছে, যখন দেশটি দীর্ঘ অস্থিরতার পর তুলনামূলক স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ, মুদ্রার অনিশ্চয়তা এবং কঠোর আর্থিক সমন্বয়ের বছরগুলো পেরিয়ে অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, স্থিতিশীলতা অর্জনের পর পরবর্তী গন্তব্য কী?

এবারের বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সংযত চরিত্র। সরকার ব্যয়ের লাগাম ছেড়ে দিয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথ বেছে নেয়নি। বরং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে সীমিত পরিসরে কিছু খাতকে উৎসাহ দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো অনেকের প্রত্যাশা পূরণ করবে না, কিন্তু বাস্তবতা হলো রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা এখনো সংকুচিত। ফলে নীতিনির্ধারকদের জন্য সাহসী প্রতিশ্রুতির চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।

বাজেটে আর্থিক ঘাটতি ও প্রাইমারি উদ্বৃত্তের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা মূলত বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে একটি বার্তা বহন করে—পাকিস্তান অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার পথে থাকতে চায়। অর্থনীতির ভাষায় এটি হয়তো আকর্ষণীয় শোনায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে ওঠে এমন সিদ্ধান্তের ওপরই।

একই সঙ্গে কিছু খাতে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা লক্ষণীয়। চাকরিজীবীদের জন্য কর কাঠামোয় পরিবর্তন, নির্দিষ্ট করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ কমানো এবং আবাসন খাতে কিছু কর হ্রাস ব্যবসা ও ভোক্তা—উভয় পক্ষের জন্য ইতিবাচক সংকেত। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে মন্থর থাকা সম্পত্তি খাতে এই পদক্ষেপ লেনদেন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। কারণ আবাসন খাতের সঙ্গে বহু শিল্প ও সেবাখাত প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

মূল্যস্ফীতি হ্রাস নয় আরও স্ফীত হচ্ছে

ডিজিটাল অর্থনীতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানির ওপর গুরুত্ব আরেকটি ইতিবাচক দিক। বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় শুধুমাত্র ঐতিহ্যগত খাতের ওপর নির্ভর করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি সম্ভব নয়। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, সফটওয়্যার এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্প আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে। বাজেটে এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়।

অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের দুর্বল অংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। বাজারের ধাক্কা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।

তবে ইতিবাচক দিকগুলোর মাঝেও বড় কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই বাজেট কি প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে সক্ষম? সংকট মোকাবিলার পর্যায় থেকে বেরিয়ে আসার পর ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা করছেন। তারা এমন নীতির খোঁজ করছেন, যা উৎপাদন বাড়াবে, রপ্তানিকে বহুমুখী করবে, নতুন শিল্প গড়ে তুলবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

বাস্তবে বাজেটে কিছু প্রণোদনা থাকলেও একটি সুসংহত শিল্পায়ন কৌশল স্পষ্টভাবে অনুপস্থিত। উৎপাদনশীল খাতে বড় বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ, আমদানি নির্ভরতা কমানো কিংবা নতুন রপ্তানি সক্ষমতা তৈরির মতো বিষয়গুলো আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হতে পারত। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেটি নিজে থেকে প্রবৃদ্ধি তৈরি করে না।

রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রের আয় বাড়ানো জরুরি, কিন্তু সেই আয় কীভাবে আসবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরেই আনুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করে আসছেন যে করের বড় বোঝা তাদের কাঁধেই পড়ে, অথচ অর্থনীতির বড় অংশ এখনো করের আওতার বাইরে। তাই রাজস্ব বৃদ্ধি যদি শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে অর্জিত হয়, তাহলে তা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও দুর্বল করতে পারে। প্রয়োজন করের ভিত্তি বিস্তৃত করা এবং নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে আনা।

বাজেটের আরেকটি সীমাবদ্ধতা রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কাঠামোতেই নিহিত। সরকারের বড় অংশের ব্যয় নির্ধারিত বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ থাকায় উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। ফলে অবকাঠামো, জ্বালানি, পানি ব্যবস্থাপনা বা ডিজিটাল রূপান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ থাকলেও তার পরিসর প্রয়োজনের তুলনায় ছোট থেকে যাচ্ছে।

Budget 2026-2027: Guide to Key Economic Terms

এখানেই বৃহত্তর বাস্তবতা সামনে আসে। কোনো দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কেবল বার্ষিক বাজেটের ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নয়ন, নীতির ধারাবাহিকতা, সাশ্রয়ী জ্বালানি, সহজতর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ—এসবই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির আসল ভিত্তি। কর ছাড় বা কর বৃদ্ধি সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশ বিবেচনা করেই।

সুতরাং এই বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ঘোষণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিশ্রুত সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবে রূপ নেয়। নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসা পরিবেশ তৈরি না হলে বাজেটের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোরও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

বর্তমান বাজেটকে তাই সংকট-পরবর্তী পুনর্গঠনের একটি ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি অর্জিত স্থিতিশীলতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে এবং নির্বাচিত কিছু খাতে সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির যাত্রাপথ এখানেই শেষ নয়। আগামী অধ্যায় হতে হবে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, উদ্ভাবন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অধ্যায়।

সামগ্রিক বিচারে এই বাজেটকে একপাক্ষিকভাবে সফল বা ব্যর্থ বলা কঠিন। এটি বাস্তবতার সীমার মধ্যে তৈরি একটি নীতিপত্র, যা স্থিতিশীলতার গুরুত্ব স্বীকার করে এবং কিছু প্রয়োজনীয় স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের আরও বড় প্রশ্ন সামনে রেখে যায়—পাকিস্তান কীভাবে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি ও বিস্তৃত সমৃদ্ধির পথে এগোবে?

স্থিতিশীলতা অবশ্যই একটি অর্জন। কিন্তু একটি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি হয়ে ফিরে আসে। এখন পাকিস্তানের সামনে সেই কঠিন কিন্তু অপরিহার্য পথচলাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।