০৫:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
নামমাত্র স্থিতিশীলতা নয়, এখন প্রয়োজন প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায় নতুন যৌবনের ওষুধ নয়, স্বাস্থ্য বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ জানালা প্রফেসর ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ: যোগ্যতা যাকে সম্মানিত করেছে এক প্রশ্নে একমত ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান: এআই কি খুব দ্রুত এগোচ্ছে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে বাড়ছে জনঅসন্তোষ, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ভারতের গ্রামে স্মার্টফোন বিপ্লব, বদলে যাচ্ছে শিক্ষা, কাজ আর সামাজিক জীবন ভেনেজুয়েলার সোনার খনিতে নতুন সমীকরণ, মার্কিন তৎপরতায় বদলে যাচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য ইউরোপের শিল্প সংকট কি সত্যিই চীনের কারণে? নিজেদের দুর্বলতাই বড় চ্যালেঞ্জ ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে আশা, কিন্তু সংকট কাটাতে দরকার কঠিন সিদ্ধান্ত নীরব জ্ঞান শেখাতে গিয়ে নতুন সংকটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ভেনেজুয়েলার সোনার খনিতে নতুন সমীকরণ, মার্কিন তৎপরতায় বদলে যাচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য

ভেনেজুয়েলার পূর্বাঞ্চলের বলিভার অঙ্গরাজ্যের লাস ক্লারিতাস দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সোনাখনির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এক সময় যেখানে খনিশ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় এলাকা সরব থাকত, সেখানে এখন নেমে এসেছে অস্বাভাবিক নীরবতা। সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ফলে অঞ্চলটির ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর পেছনে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সোনার ভাণ্ডারকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব।

খনি অঞ্চলে নতুন বাস্তবতা

বছরের পর বছর ধরে লাস ক্লারিতাস ও আশপাশের খনিগুলো স্থানীয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা খনিশ্রমিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করত এবং অবৈধ খনন কার্যক্রম পরিচালনা করত। সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পর হাজার হাজার স্বর্ণ অনুসন্ধানকারী এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

Venezuela's gold fever fuels gangs and insecurity: 'There will be anarchy'  | Venezuela | The Guardian

এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধী চক্রের দখলে থাকা অঞ্চলে নতুন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। খনি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্যও পথ খুলে দিতে পারে।

বিনিয়োগ ফেরানোর উদ্যোগ

ভেনেজুয়েলার খনিজ সম্পদ বিশ্বের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। লাস ক্লারিতাস ও এর আশপাশের এলাকায় বিশ্বের বৃহত্তম অনাবিষ্কৃত সোনার মজুতগুলোর একটি রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে বিপুল পরিমাণ লৌহ আকরিকও রয়েছে।

গত দুই দশকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে খনিজ খাতের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। ফলে বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটি তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি।

এখন বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নতুন আইন ও নীতিমালার মাধ্যমে খনি খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা, কম রয়্যালটি এবং বিরোধ নিষ্পত্তির নতুন সুযোগ তৈরির চেষ্টা চলছে।

সম্ভাবনা যত বড়, চ্যালেঞ্জও তত গভীর

যদিও খনি খাতে নতুন আশার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবতা অনেক কঠিন। বহু খনির অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের বড় অংশ পানিতে ডুবে আছে। যন্ত্রপাতির অধিকাংশই অচল অথবা নষ্ট হয়ে গেছে।

Arc of Desperation

খনি বিশেষজ্ঞেরও তীব্র সংকট রয়েছে। দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দক্ষ জনবল দেশ ছেড়ে চলে গেছে বা অন্য পেশায় চলে গেছে। ফলে উৎপাদন বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদও প্রয়োজন হবে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে

অপরাধী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযান কিছুটা সাফল্য আনলেও হুমকি পুরোপুরি দূর হয়নি। খনি অঞ্চলজুড়ে এখনো বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর উপস্থিতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গোষ্ঠীকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এসব চক্র প্রায়ই নতুন এলাকায় সরে গিয়ে আবারও তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রশ্ন

ভেনেজুয়েলার সোনা উৎপাদনের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ উৎসের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির সোনার গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। অনেক পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান এমন সোনা গ্রহণ করতে অনাগ্রহী।

এখন আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো দাবি করছে, তারা সরাসরি খনন কার্যক্রম পরিচালনা করলে উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল করা সম্ভব হবে। তবে সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিতর্কের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্য।

ভেনেজুয়েলার সোনার খনি তাই আজ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বরং ক্ষমতা, নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক জটিল পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে এই খাত দেশটির অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে নাকি নতুন সংঘাতের জন্ম দেবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Predatory mining in Venezuela: The Orinoco Mining Arc, enclave economies  and the National Mining Plan | World Rainforest Movement

 

জনপ্রিয় সংবাদ

নামমাত্র স্থিতিশীলতা নয়, এখন প্রয়োজন প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়

ভেনেজুয়েলার সোনার খনিতে নতুন সমীকরণ, মার্কিন তৎপরতায় বদলে যাচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য

০২:৪৮:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

ভেনেজুয়েলার পূর্বাঞ্চলের বলিভার অঙ্গরাজ্যের লাস ক্লারিতাস দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সোনাখনির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এক সময় যেখানে খনিশ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় এলাকা সরব থাকত, সেখানে এখন নেমে এসেছে অস্বাভাবিক নীরবতা। সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ফলে অঞ্চলটির ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর পেছনে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সোনার ভাণ্ডারকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব।

খনি অঞ্চলে নতুন বাস্তবতা

বছরের পর বছর ধরে লাস ক্লারিতাস ও আশপাশের খনিগুলো স্থানীয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা খনিশ্রমিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করত এবং অবৈধ খনন কার্যক্রম পরিচালনা করত। সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পর হাজার হাজার স্বর্ণ অনুসন্ধানকারী এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

Venezuela's gold fever fuels gangs and insecurity: 'There will be anarchy'  | Venezuela | The Guardian

এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধী চক্রের দখলে থাকা অঞ্চলে নতুন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। খনি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্যও পথ খুলে দিতে পারে।

বিনিয়োগ ফেরানোর উদ্যোগ

ভেনেজুয়েলার খনিজ সম্পদ বিশ্বের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। লাস ক্লারিতাস ও এর আশপাশের এলাকায় বিশ্বের বৃহত্তম অনাবিষ্কৃত সোনার মজুতগুলোর একটি রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে বিপুল পরিমাণ লৌহ আকরিকও রয়েছে।

গত দুই দশকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে খনিজ খাতের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। ফলে বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটি তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি।

এখন বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নতুন আইন ও নীতিমালার মাধ্যমে খনি খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা, কম রয়্যালটি এবং বিরোধ নিষ্পত্তির নতুন সুযোগ তৈরির চেষ্টা চলছে।

সম্ভাবনা যত বড়, চ্যালেঞ্জও তত গভীর

যদিও খনি খাতে নতুন আশার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবতা অনেক কঠিন। বহু খনির অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের বড় অংশ পানিতে ডুবে আছে। যন্ত্রপাতির অধিকাংশই অচল অথবা নষ্ট হয়ে গেছে।

Arc of Desperation

খনি বিশেষজ্ঞেরও তীব্র সংকট রয়েছে। দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দক্ষ জনবল দেশ ছেড়ে চলে গেছে বা অন্য পেশায় চলে গেছে। ফলে উৎপাদন বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদও প্রয়োজন হবে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে

অপরাধী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযান কিছুটা সাফল্য আনলেও হুমকি পুরোপুরি দূর হয়নি। খনি অঞ্চলজুড়ে এখনো বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর উপস্থিতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গোষ্ঠীকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এসব চক্র প্রায়ই নতুন এলাকায় সরে গিয়ে আবারও তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রশ্ন

ভেনেজুয়েলার সোনা উৎপাদনের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ উৎসের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির সোনার গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। অনেক পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান এমন সোনা গ্রহণ করতে অনাগ্রহী।

এখন আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো দাবি করছে, তারা সরাসরি খনন কার্যক্রম পরিচালনা করলে উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল করা সম্ভব হবে। তবে সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিতর্কের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্য।

ভেনেজুয়েলার সোনার খনি তাই আজ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বরং ক্ষমতা, নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক জটিল পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে এই খাত দেশটির অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে নাকি নতুন সংঘাতের জন্ম দেবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Predatory mining in Venezuela: The Orinoco Mining Arc, enclave economies  and the National Mining Plan | World Rainforest Movement