কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে কর্মক্ষেত্রে আরও কার্যকর করতে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু তথ্যভান্ডার বা লিখিত নির্দেশনার ওপর নির্ভর করছে না। বরং মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, অন্তর্দৃষ্টি এবং কাজের অঘোষিত কৌশল—যা সাধারণত “নীরব জ্ঞান” নামে পরিচিত—সেটিও যন্ত্রকে শেখানোর চেষ্টা চলছে। তবে এই প্রচেষ্টা যেমন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে, তেমনি তৈরি করছে জটিল কিছু প্রশ্নও।
নীরব জ্ঞান এমন এক ধরনের দক্ষতা, যা মানুষ কাজে ব্যবহার করলেও অনেক সময় ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে না। একজন অভিজ্ঞ কর্মী জানেন কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কিন্তু কেন তিনি সেই সিদ্ধান্ত নিলেন, তা সবসময় স্পষ্ট করে বলতে পারেন না। ফলে এই জ্ঞানকে এআইয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ নয়।
তথ্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অভিজ্ঞতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিষ্ঠানের নথি, পুরোনো কাজের উদাহরণ, বিপণন সামগ্রী কিংবা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার তথ্যের মধ্যেই অনেক নীরব জ্ঞান লুকিয়ে থাকে। এআই এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন কিছু ধরণ ও সম্পর্ক খুঁজে বের করতে পারে, যা মানুষের পক্ষে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
এ কারণেই আধুনিক এআই অনেক ক্ষেত্রে এমন দক্ষতা অর্জন করছে, যা তাকে সরাসরি শেখানো হয়নি। তথ্যের ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম সংকেত থেকে সে ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি শিখে নেয়।

ভিডিওতে ধরা পড়ে অদেখা কৌশল
তবে সব ধরনের দক্ষতা শুধু তথ্য বিশ্লেষণ করে শেখা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে কাজের সূক্ষ্ম ধাপগুলো বোঝা জরুরি হয়ে পড়ে। নির্মাণ খাতে এআইচালিত রোবট তৈরির সময় এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন গবেষকেরা।
ইট বসানোর কাজ নিয়ে অভিজ্ঞ রাজমিস্ত্রিদের জিজ্ঞাসা করা হলে তারা প্রায়ই বলতেন, “সবসময় এভাবেই করেছি।” কিন্তু কেন এভাবে করেন, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারতেন না। পরে দীর্ঘ সময়ের ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইট বসানোর সময় তারা হাতে খুব সামান্য কম্পন তৈরি করেন। এতে গাঁথুনির উপকরণ ইটের ভেতরে আরও ভালোভাবে প্রবেশ করে এবং বন্ধন শক্তিশালী হয়। সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই রোবটের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়।
কর্মীদের নজরদারি নিয়ে উদ্বেগ
নীরব জ্ঞান সংগ্রহের আরেকটি উপায় হচ্ছে কর্মীদের কাজ আরও বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা। কল সেন্টারের মতো কিছু খাতে ফোনকল, কম্পিউটার ব্যবহার এবং কাজের ধাপ আগেই রেকর্ড করা হয়। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের তথ্য আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করে এআইকে প্রশিক্ষণ দিতে আগ্রহী।
কিন্তু এখানেই দেখা দিচ্ছে গোপনীয়তা ও নজরদারির প্রশ্ন। অনেক কর্মী মনে করেন, তাদের কাছে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান রয়েছে, যা তারা চাইলে গোপন রাখতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কর্মীদের জানানো হয় যে তাদের তথ্য এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে, তখন তারা সেই তথ্য ভাগাভাগি করতে কম আগ্রহ দেখান।

সব জ্ঞান কি ধরা সম্ভব?
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের মনের ভেতরের জ্ঞান। একজন কর্মী গ্রাহকের পছন্দ, সম্পর্কের সূক্ষ্মতা বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে বিচার করেন, তা সবসময় তথ্য হিসেবে ধরা যায় না।
তাই অনেক প্রতিষ্ঠান বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এআইয়ের কাজ মূল্যায়ন করানোর পথ বেছে নিচ্ছে। নকশার সৌন্দর্য, গবেষণার মান বা সৃজনশীলতার মতো বিষয়গুলোতে মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এআইকে ধীরে ধীরে উন্নত করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন
প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অভিজ্ঞ কর্মীদের অবসরের সঙ্গে জ্ঞান হারানোর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এআই সেই সমস্যার সমাধান দিতে পারে। তবে এর সঙ্গে নতুন কিছু প্রশ্নও সামনে আসছে।
একজন কর্মীর অঘোষিত জ্ঞানের মালিক কে? কতটা নজরদারি গ্রহণযোগ্য? আর যদি যন্ত্র ধীরে ধীরে মানুষের অভিজ্ঞতাভিত্তিক দক্ষতা শিখে নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে মানুষ কীভাবে সেই জ্ঞান অর্জন করবে, চর্চা করবে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, নীরব জ্ঞানকে এআইয়ের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা আগামী দিনের কর্মক্ষেত্র ও প্রযুক্তির সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















