এক সময় সিলিকন ভ্যালির সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিচয় ছিল ‘ইউনিকর্ন’ স্টার্টআপ। এক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যায়ন পাওয়া এসব প্রতিষ্ঠানকে ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক তারকা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন সেই জগতে নতুন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে—‘জম্বি ইউনিকর্ন’। অর্থাৎ, যে প্রতিষ্ঠান একসময় বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যায়ন পেয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে তার আগের শক্তি, প্রবৃদ্ধি ও বাজারমূল্যের অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে উদ্বেগে পড়েছেন বিনিয়োগকারী এবং ঝুঁকিপূর্ণ মূলধন তহবিল পরিচালনাকারীরা। অনেক স্টার্টআপ এখন আগের মূল্যায়ন ধরে রাখতে পারছে না, আবার নতুন অর্থায়ন সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
মূল্যায়নের বুদবুদ ফেটে যাচ্ছে
বিশ্বজুড়ে স্টার্টআপ খাতে কয়েক বছর আগে যে উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল, তার বড় কারণ ছিল অত্যন্ত কম সুদের হার। বেশি মুনাফার আশায় বিনিয়োগকারীরা বিপুল অর্থ ঢেলেছিলেন নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানিগুলোতে। তখন অনেক প্রতিষ্ঠানই সীমিত আয় এবং অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও আকাশছোঁয়া মূল্যায়ন পেয়ে যায়।

কিন্তু অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর সেই চিত্র পাল্টে গেছে। সুদের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন তহবিল সংগ্রহে ধস নেমেছে। ফলে আগের অতিরঞ্জিত মূল্যায়নের বাস্তবতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অনেক প্রতিষ্ঠানের মূল্য কমে গেছে
কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে মূল্যায়নের পতন নাটকীয়। মহামারির সময় জনপ্রিয়তা পাওয়া কিছু প্রতিষ্ঠান তখন বিপুল মূল্যায়ন পেলেও বর্তমানে তাদের বাজারমূল্য আগের তুলনায় অনেক কম।
আবার যেসব স্টার্টআপের ব্যবসায়িক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্ত, তারাও নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহের সময় আগের মূল্যায়ন ধরে রাখতে পারছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে কম মূল্যায়নে অর্থ সংগ্রহ করছে। এতে তাদের ইউনিকর্ন মর্যাদাও হারিয়ে যাচ্ছে।
বাজারে প্রবেশের পথও কঠিন
সাধারণত একটি স্টার্টআপ পাঁচ থেকে দশ বছর প্রবৃদ্ধির পর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় অথবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুই পথই কঠিন হয়ে উঠেছে।
অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো বিনিয়োগকারীরা কম মূল্যায়নে শেয়ারবাজারে যাওয়ার বিরোধিতা করছেন। তাদের আশা, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি উন্নত হলে কোম্পানির মূল্য আবার বাড়তে পারে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে ঝুঁকছে বিনিয়োগ
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের বড় অংশের নজর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন প্রতিষ্ঠানের দিকে। ফলে পুরোনো প্রযুক্তি স্টার্টআপগুলোর জন্য নতুন অর্থায়ন পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
যেসব কোম্পানি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে, তারা ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সুযোগ খুঁজছে। তবে সবার পক্ষে সেই রূপান্তর সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিনিয়োগ খাতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে বহু পুরোনো স্টার্টআপকে নতুন করে মূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হবে। কেউ কম দামে বিক্রি হবে, কেউ নতুন বিনিয়োগ পাবে, আবার কেউ ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতেও বাধ্য হতে পারে।
এর প্রভাব শুধু স্টার্টআপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঝুঁকিপূর্ণ মূলধন তহবিলগুলোর আয়ও কমে যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে নতুন তহবিলে অর্থ দিতে বড় বিনিয়োগকারীরা আরও সতর্ক হয়ে উঠবেন।
তবে কিছু বিনিয়োগকারী এখনও আশা করছেন, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সফল বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে আবারও আস্থা ফিরতে পারে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান ‘জম্বি ইউনিকর্ন’ সমস্যার সমাধান এত সহজ হবে না বলেই মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















