ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি এতদিন প্লাস্টিকের মডেল, যন্ত্রাংশ, ডেন্টাল ইমপ্লান্ট কিংবা ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত হলেও এবার এর সম্ভাবনা পৌঁছে গেছে আরও বিস্ময়কর এক পর্যায়ে। গবেষকেরা এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে জীবন্ত টিস্যুসহ অত্যন্ত সংবেদনশীল উপাদানের ওপর সরাসরি ইলেকট্রনিক সার্কিট ছাপানো সম্ভব হবে।
এই অগ্রগতি ভবিষ্যতে চিকিৎসা প্রযুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এমন ইমপ্লান্ট তৈরি করা সম্ভব হবে, যা শরীরের ভেতরের অবস্থা তারবিহীনভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং রোগীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য দেবে।
সংবেদনশীল উপাদানে সার্কিট ছাপার চ্যালেঞ্জ
ইলেকট্রনিক সার্কিট থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের ধারণা নতুন নয়। সাধারণত বিশেষ ধরনের কালি ব্যবহার করে সার্কিট তৈরি করা হয়, যেখানে তামা, রুপা বা সোনার ক্ষুদ্র পরিবাহী কণা থাকে। পরে তাপ বা লেজারের সাহায্যে এসব কণাকে একত্রিত করে বিদ্যুৎ পরিবাহী পথ তৈরি করা হয়।
তবে এ পদ্ধতির একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সার্কিট তৈরির জন্য যে তাপের প্রয়োজন হয়, তা অনেক সময় সংবেদনশীল উপাদান বা জীবন্ত টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। ফলে চিকিৎসা বা জৈব প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এর ব্যবহার সীমিত ছিল।

মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির নতুন সমাধান
গবেষকেরা এবার সেই সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছেন। তারা এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যেখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম মাইক্রোওয়েভ রশ্মি ব্যবহার করে কেবল কালি-কণাগুলোকে উত্তপ্ত করা যায়। এর ফলে আশপাশের উপাদান বা জীবন্ত টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
এই প্রযুক্তিতে বিশেষ রেজোনেটর ও সূক্ষ্ম অগ্রভাগ ব্যবহার করা হয়েছে, যা মাইক্রোওয়েভ শক্তিকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করতে সক্ষম। পুরো ব্যবস্থাটি এতটাই ছোট যে সাধারণ ডেস্কটপ থ্রিডি প্রিন্টারের সঙ্গেও যুক্ত করা যায়।
গবেষকদের মতে, রশ্মির শক্তি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সার্কিটের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন মাত্রার পরিবাহিতা তৈরি করা সম্ভব। ফলে তারের মধ্যেই রোধকের মতো উপাদান তৈরি করা যাবে।
চিকিৎসা প্রযুক্তিতে বিপ্লবের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ব্যবহার হতে পারে চিকিৎসা ক্ষেত্রে। বর্তমানে থ্রিডি প্রিন্টিং ব্যবহার করে প্রতিস্থাপনের জন্য বিভিন্ন জৈব টিস্যু তৈরি করা হচ্ছে। এসব টিস্যুর সঙ্গে ইলেকট্রনিক সার্কিট যুক্ত করা গেলে সেগুলো স্মার্ট সেন্সরে পরিণত হবে।

এ ধরনের টিস্যু রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপনের পর তার কার্যকারিতা, সুস্থতার অগ্রগতি কিংবা অঙ্গের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য দিতে পারবে। এমনকি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অঙ্গের কার্যক্রম উদ্দীপিত করতেও সহায়তা করতে পারে।
ইতোমধ্যে গবেষকেরা গরুর উরুর হাড় এবং মানুষের কৃত্রিম হাঁটু ও নিতম্ব তৈরিতে ব্যবহৃত পলিমারের ওপর সফলভাবে সেন্সর ছাপাতে সক্ষম হয়েছেন।
স্মার্ট ওষুধের পথও খুলছে
এই প্রযুক্তির আরেকটি সম্ভাবনাময় ব্যবহার হচ্ছে তথাকথিত ‘স্মার্ট পিল’ বা কম্পিউটারনির্ভর ওষুধে। এসব ক্ষুদ্র ডিভাইস শরীরের ভেতর থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বাইরে পাঠাতে পারে অথবা নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ ছাড়ার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
গবেষকেরা এমনকি একটি জীবন্ত পাতার ওপরও আর্দ্রতা পরিমাপক সেন্সর ছাপাতে সফল হয়েছেন। ফলে শুধু চিকিৎসা নয়, কৃষি ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণেও এ প্রযুক্তির নতুন ব্যবহার দেখা যেতে পারে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবন্ত টিস্যুর ওপর ইলেকট্রনিক সার্কিট ছাপার এই সক্ষমতা ভবিষ্যতের চিকিৎসা, জৈব প্রকৌশল এবং স্মার্ট ডিভাইস উন্নয়নে নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















