হাঙ্গেরির নতুন প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগইয়ার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তার লক্ষ্য একদিকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করা।
সম্প্রতি পার্লামেন্টে তিনি “শুদ্ধি অভিযান” নামে একটি সাংবিধানিক সংশোধন প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই উদ্যোগের আওতায় রাষ্ট্রপতি তামাস শুলিয়ক এবং সাংবিধানিক আদালতের প্রধান পিটার পোল্টসহ আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার পদে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
মাগইয়ারের ভাষায়, দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য ভেঙে আরও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী সাংবিধানিক আদালতের বিচারকদের জন্য ৭০ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক অবসরের বিধান ফিরিয়ে আনা হবে। এর ফলে আদালতের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ বিচারক অবিলম্বে পদ ছাড়তে বাধ্য হতে পারেন।
এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১২ বছরে সীমিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে একটি বিশেষ সম্পদ পুনরুদ্ধার সংস্থা গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও সাংবিধানিক বিতর্ক
ক্ষমতায় আসার পর মাগইয়ার রাষ্ট্রপতি, সাংবিধানিক আদালতের বিচারক, সরকারি কৌঁসুলি এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানদের পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তারা কেউই সাড়া দেননি। ফলে সরকার সাংবিধানিক সংশোধনের পথ বেছে নিয়েছে।
মাগইয়ারের দল তিসা পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভোগ করছে। ফলে সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন তাদের হাতে রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে রাষ্ট্রপতির বর্তমান মেয়াদ নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে যাবে।
তবে সমালোচকদের মতে, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের পদ থেকে সরানোর জন্য সংবিধান সংশোধন করা আইনের শাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্কিত হতে পারে। অন্যদিকে সরকারের সমর্থকদের দাবি, আগের শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের জন্য এমন পদক্ষেপ প্রয়োজন।
অরবানের প্রত্যাবর্তনের পথ বন্ধ?
এর আগেও মাগইয়ার সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করেছে, যার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময়সীমা সর্বোচ্চ আট বছরে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান, যিনি প্রায় দুই দশক ক্ষমতায় ছিলেন, ভবিষ্যতে আর সেই পদে ফিরতে পারবেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে অরবান নিজেও সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একাধিকবার সংবিধান পরিবর্তন করেছিলেন। বর্তমান সরকার এখন একই সাংবিধানিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে চ্যালেঞ্জ করছে।
নতুন সংবিধানের পথে
সরকারের পরবর্তী লক্ষ্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন। জাতীয় পর্যায়ে মতামত গ্রহণের পর এ বিষয়ে গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন সংবিধানে ভবিষ্যতে সংশোধনী আরও কঠিন করার প্রস্তাব থাকতে পারে, যাতে কোনো একক দল বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সহজে রাষ্ট্রের মৌলিক নিয়ম পরিবর্তন করতে না পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে হাঙ্গেরির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিরোধীরা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছে। ফলে দেশটির রাজনীতিতে বিতর্ক ও উত্তেজনা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















