০৪:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
প্রফেসর ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ: যোগ্যতা যাকে সম্মানিত করেছে এক প্রশ্নে একমত ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান: এআই কি খুব দ্রুত এগোচ্ছে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে বাড়ছে জনঅসন্তোষ, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ভারতের গ্রামে স্মার্টফোন বিপ্লব, বদলে যাচ্ছে শিক্ষা, কাজ আর সামাজিক জীবন ভেনেজুয়েলার সোনার খনিতে নতুন সমীকরণ, মার্কিন তৎপরতায় বদলে যাচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য ইউরোপের শিল্প সংকট কি সত্যিই চীনের কারণে? নিজেদের দুর্বলতাই বড় চ্যালেঞ্জ ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে আশা, কিন্তু সংকট কাটাতে দরকার কঠিন সিদ্ধান্ত নীরব জ্ঞান শেখাতে গিয়ে নতুন সংকটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইজিজেটকে ঘিরে অধিগ্রহণ নাটক, ভেঙে বিক্রির শঙ্কায় ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ বাজেট এয়ারলাইন নতুন আতঙ্ক ‘জম্বি ইউনিকর্ন’: সিলিকন ভ্যালিতে কমছে স্টার্টআপের জৌলুস

জার্মানির শহরগুলো কেন দেউলিয়ার পথে, আর কেন বাড়ছে কট্টর ডানপন্থার আশঙ্কা

এক সময় সমৃদ্ধি ও শিল্পোন্নয়নের প্রতীক ছিল জার্মানির অনেক শহর। কিন্তু এখন দেশটির অসংখ্য পৌরসভা ও নগর প্রশাসন তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে। কর আয় কমে যাওয়া, ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরকারি দায়িত্বের চাপ বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় প্রশাসনগুলো একের পর এক বাজেট ঘাটতির মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে জনঅসন্তোষ বাড়তে পারে এবং তার রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে কট্টর ডানপন্থী শক্তি।

বাভারিয়ার মাঝারি আকারের শহর ইনগলস্টাড তার একটি বড় উদাহরণ। শহরটির উত্থান মূলত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অডির সাফল্যের ওপর নির্ভর করে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ছোট্ট শহরটি ধীরে ধীরে শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অডি ও এর মূল কোম্পানির ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের প্রভাব সরাসরি পড়েছে শহরের অর্থনীতিতে।

কর আয়ে বড় ধাক্কা

স্থানীয় ব্যবসা থেকে আদায় হওয়া করের আয় কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে শহরের বাজেট এতটাই চাপে পড়েছে যে নতুন বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হয়েছে। বহু গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত রয়েছে। এমনকি একটি জরাজীর্ণ স্কুল ভবন মেরামতের অর্থ না থাকায় শিক্ষার্থীদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে।

Why Germany's cities are going broke

শুধু ইনগলস্টাড নয়, জার্মানির বহু শহর একই ধরনের সংকটে আক্রান্ত। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য বা ব্যর্থতার সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের আর্থিক অবস্থার গভীর সম্পর্ক থাকায় অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব দ্রুত শহরগুলোর ওপর পড়ছে।

রেকর্ড বাজেট ঘাটতি

সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, জার্মানির প্রায় ১০ হাজার পৌরসভার সম্মিলিত বাজেট ঘাটতি গত বছর রেকর্ড ৩২ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। এক বছরের ব্যবধানে এই ঘাটতি প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। অধিকাংশ পৌরসভাই মনে করছে, পরিস্থিতি সামনে আরও খারাপ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণ ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, কর্মচারী ব্যয় এবং সামাজিক সেবা খাতে বাধ্যতামূলক ব্যয় বৃদ্ধিই সংকটের প্রধান কারণ। শিশু ও প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

ফলে উন্নয়নমূলক খাতে খরচ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে শহরগুলো। রাস্তা, স্কুল, ক্রীড়া অবকাঠামো ও জনসেবামূলক স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ পিছিয়ে যাচ্ছে। দেশের পৌর বিনিয়োগ ঘাটতি এখন ২৩১ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে।

VW's Audi halts A4, A5 production at Ingolstadt over parts shortage |  Reuters

জনসেবায় অবনতি

সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনে দেখা যাচ্ছে। কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল হচ্ছে, কোথাও গ্রন্থাগার অনুদান চাইছে। অনেক শহর দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভর করছে।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও আগামী বছরগুলোতে অনেক শহর আরও কঠিন অবস্থায় পড়তে পারে। তাই তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অতিরিক্ত সহায়তা ও নতুন ব্যয়ের জন্য অর্থায়নের দাবি জানাচ্ছে।

রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্বেগও বাড়ছে। অনেকের আশঙ্কা, যখন মানুষ দেখবে স্কুলের ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ছে, রাস্তা মেরামত হচ্ছে না বা জনসেবার মান কমছে, তখন তারা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারাতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, জনপরিসেবার অবনতির সুযোগ নিয়ে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে। তাই এই আর্থিক সংকট শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যতে জার্মানির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

এখন সবার নজর কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে। শহরগুলো আশা করছে, দ্রুত আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। অন্যথায় স্থানীয় প্রশাসনের সংকট আরও গভীর হয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রফেসর ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ: যোগ্যতা যাকে সম্মানিত করেছে

জার্মানির শহরগুলো কেন দেউলিয়ার পথে, আর কেন বাড়ছে কট্টর ডানপন্থার আশঙ্কা

০২:০৪:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

এক সময় সমৃদ্ধি ও শিল্পোন্নয়নের প্রতীক ছিল জার্মানির অনেক শহর। কিন্তু এখন দেশটির অসংখ্য পৌরসভা ও নগর প্রশাসন তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে। কর আয় কমে যাওয়া, ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরকারি দায়িত্বের চাপ বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় প্রশাসনগুলো একের পর এক বাজেট ঘাটতির মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে জনঅসন্তোষ বাড়তে পারে এবং তার রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে কট্টর ডানপন্থী শক্তি।

বাভারিয়ার মাঝারি আকারের শহর ইনগলস্টাড তার একটি বড় উদাহরণ। শহরটির উত্থান মূলত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অডির সাফল্যের ওপর নির্ভর করে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ছোট্ট শহরটি ধীরে ধীরে শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অডি ও এর মূল কোম্পানির ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের প্রভাব সরাসরি পড়েছে শহরের অর্থনীতিতে।

কর আয়ে বড় ধাক্কা

স্থানীয় ব্যবসা থেকে আদায় হওয়া করের আয় কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে শহরের বাজেট এতটাই চাপে পড়েছে যে নতুন বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হয়েছে। বহু গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত রয়েছে। এমনকি একটি জরাজীর্ণ স্কুল ভবন মেরামতের অর্থ না থাকায় শিক্ষার্থীদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে।

Why Germany's cities are going broke

শুধু ইনগলস্টাড নয়, জার্মানির বহু শহর একই ধরনের সংকটে আক্রান্ত। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য বা ব্যর্থতার সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের আর্থিক অবস্থার গভীর সম্পর্ক থাকায় অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব দ্রুত শহরগুলোর ওপর পড়ছে।

রেকর্ড বাজেট ঘাটতি

সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, জার্মানির প্রায় ১০ হাজার পৌরসভার সম্মিলিত বাজেট ঘাটতি গত বছর রেকর্ড ৩২ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। এক বছরের ব্যবধানে এই ঘাটতি প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। অধিকাংশ পৌরসভাই মনে করছে, পরিস্থিতি সামনে আরও খারাপ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণ ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, কর্মচারী ব্যয় এবং সামাজিক সেবা খাতে বাধ্যতামূলক ব্যয় বৃদ্ধিই সংকটের প্রধান কারণ। শিশু ও প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

ফলে উন্নয়নমূলক খাতে খরচ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে শহরগুলো। রাস্তা, স্কুল, ক্রীড়া অবকাঠামো ও জনসেবামূলক স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ পিছিয়ে যাচ্ছে। দেশের পৌর বিনিয়োগ ঘাটতি এখন ২৩১ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে।

VW's Audi halts A4, A5 production at Ingolstadt over parts shortage |  Reuters

জনসেবায় অবনতি

সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনে দেখা যাচ্ছে। কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল হচ্ছে, কোথাও গ্রন্থাগার অনুদান চাইছে। অনেক শহর দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভর করছে।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও আগামী বছরগুলোতে অনেক শহর আরও কঠিন অবস্থায় পড়তে পারে। তাই তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অতিরিক্ত সহায়তা ও নতুন ব্যয়ের জন্য অর্থায়নের দাবি জানাচ্ছে।

রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্বেগও বাড়ছে। অনেকের আশঙ্কা, যখন মানুষ দেখবে স্কুলের ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ছে, রাস্তা মেরামত হচ্ছে না বা জনসেবার মান কমছে, তখন তারা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারাতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, জনপরিসেবার অবনতির সুযোগ নিয়ে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে। তাই এই আর্থিক সংকট শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যতে জার্মানির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

এখন সবার নজর কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে। শহরগুলো আশা করছে, দ্রুত আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। অন্যথায় স্থানীয় প্রশাসনের সংকট আরও গভীর হয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।