বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখভাল করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, অনেক দেশে এখন তা আইনি বাধ্যবাধকতাতেও পরিণত হচ্ছে। এশিয়ার বিভিন্ন সরকার মনে করছে, দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবার কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে প্রবীণদের সুরক্ষায় নতুন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ফলে সন্তানদের ওপর বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও যত্নের দায়িত্ব নিশ্চিত করতে একের পর এক আইন ও নীতিমালা চালু হচ্ছে।
কঠোর হচ্ছে আইন
সম্প্রতি ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যে একটি বিল পাস হয়েছে, যার আওতায় কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যদি বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, তাহলে তার বেতনের একটি অংশ সরাসরি বাবা-মায়ের ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রাজ্য সরকার বলছে, যারা বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল নয়, তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এশিয়ার অন্য দেশগুলোও একই পথে হাঁটছে। কোথাও প্রবীণদের পরিত্যাগ বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন আনা হচ্ছে, আবার কোথাও বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দাবি আদালতের মাধ্যমে আদায়ের সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। কিছু দেশে অবহেলার জন্য কারাদণ্ডের বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে।

বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ার চাপ
বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় এশিয়ায় দ্রুতগতিতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে এশিয়ায় ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা শতকোটি ছাড়িয়েছে। আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে অনেক দেশ এখনও প্রবীণদের জন্য পর্যাপ্ত সেবাকেন্দ্র, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ব্যবস্থা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে পরিবারই প্রবীণদের প্রধান ভরসা হয়ে থাকছে। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের জন্য স্থানান্তর এবং ছোট পরিবার ব্যবস্থার কারণে সেই ঐতিহ্যগত কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা
একসময় এশিয়ার সমাজে সন্তানদের বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখা হতো। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসবাস করায় আয়ের একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই প্রবীণদের জন্য ব্যয় হতো। কিন্তু এখন অনেক তরুণ-তরুণী শহরে আলাদা বাসা নিয়ে থাকেন। তাদের সামনে বাড়ির ঋণ, সন্তানের শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয়সহ নানা আর্থিক চাপ রয়েছে।

ফলে একই আয়ের ওপর একাধিক দায়িত্ব এসে পড়ছে। তবু সমাজে বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা আগের মতোই রয়ে গেছে। এই বাস্তবতা অনেক পরিবারের জন্য নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছে।
শাস্তি নয়, প্রয়োজন সহায়তা
তবে সমালোচকদের মতে, শুধু শাস্তিমূলক আইন সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। তাদের দাবি, সরকারগুলোর উচিত প্রবীণদের জন্য আরও উন্নত সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা। দিবাযত্ন কেন্দ্র, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা সুবিধা, শেষ বয়সের চিকিৎসা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাড়ানো হলে পরিবারগুলোর ওপর চাপ কমবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে পরিবার ও রাষ্ট্র—উভয়ের ভূমিকা প্রয়োজন। শুধু সন্তানদের বাধ্য করার পরিবর্তে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার, যেখানে পরিবারগুলো বাস্তব সহায়তা পাবে এবং প্রবীণরাও নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবেন।
এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই এই বিতর্ক গুরুত্ব পাচ্ছে। বাবা-মায়ের দায়িত্ব কি শুধুই পরিবারের, নাকি রাষ্ট্রেরও? আগামী বছরগুলোতে এই প্রশ্ন আরও জোরালোভাবে সামনে আসবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















