ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুই রাজ্য আসাম ও অরুণাচল প্রদেশে ভারী বর্ষণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আসামে ২২ হাজারের বেশি মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অরুণাচলে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু সড়ক, সেতু ও বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—উজানের এই পরিস্থিতির প্রভাব কি বাংলাদেশেও বড় ধরনের বন্যা ডেকে আনতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসাম ও অরুণাচলের বন্যা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হলেও, কেবল উজানের বন্যা দেখেই বাংলাদেশে বড় বন্যা হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করে উজানের পানির প্রবাহ, দেশের অভ্যন্তরের বৃষ্টিপাত, নদীর ধারণক্ষমতা এবং পানি নিষ্কাশনের গতিসহ একাধিক বিষয়ের ওপর।
উজানে কী ঘটছে
ভারতের আসাম রাজ্যে টানা বৃষ্টিতে ব্রহ্মপুত্র ও এর উপনদীগুলোর পানি দ্রুত বেড়েছে। আসাম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, ধেমাজি, লখিমপুর, ডিব্রুগড়, নলবাড়ি, কোকরাঝাড় ও চিরাং জেলায় ২২ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধেমাজি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, যেখানে প্রায় ৯৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার ৬৯০ হেক্টর কৃষিজমি পানির নিচে চলে গেছে।
ধেমাজি জেলায় ১৯৬৫ সালে নির্মিত একটি রেলসেতুর অংশ নদীভাঙনের কারণে ধসে পড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে ওই লাইনে ট্রেন চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণীরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে অরুণাচল প্রদেশে মেঘভাঙা বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে একের পর এক এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) ২৮ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত রাজ্যটির বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি এবং বজ্রঝড়ের সতর্কতা জারি করেছে। কিছু এলাকায় ২০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।

কেন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
অরুণাচল প্রদেশে উৎপত্তি হওয়া সিয়াং নদী আসামে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়। পরে এই নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনা নামে পরিচিত হয়। ফলে অরুণাচল ও আসামে ভারী বৃষ্টির ফলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে কয়েক দিনের ব্যবধানে তার প্রভাব বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলেও পড়তে পারে।
একইভাবে মেঘালয়, আসাম ও ত্রিপুরার পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকাতেও পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাই উজানের আবহাওয়া পরিস্থিতি বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান।
বাংলাদেশের সরকারি পূর্বাভাস কী বলছে
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, ২৯ জুন থেকে ১ জুলাইয়ের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি বা সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এছাড়া সুরমা, কুশিয়ারা, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, মনু, খোয়াই, সারিগোয়াইন, জাদুকাটা ও সোমেশ্বরী নদীর পানিও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং ভারতের আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং সংলগ্ন ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।
বড় বন্যার ঝুঁকি কতটা
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বড় আকারের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা নিশ্চিত—এমন কোনো সরকারি পূর্বাভাস নেই। তবে উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বা মাঝারি মাত্রার বন্যার ঝুঁকি রয়েছে বলে সরকারি সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দিন উজানে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এবং একই সময়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলেও ভারী বর্ষণ হলে নদীর পানি আরও দ্রুত বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় বন্যার বিস্তার বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে কোন এলাকা
বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা এবং সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলার নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, নদীর পানির উচ্চতা ও বৃষ্টিপাতের তথ্য প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে নতুন পূর্বাভাস প্রকাশ করা হবে।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, আসাম ও অরুণাচলে অস্বাভাবিক বর্ষণের পর কয়েক দিনের ব্যবধানে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকায় পানির চাপ বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই চাপ কতটা বড় বন্যায় রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত, উজানের প্রবাহ এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















